আওলাদ (ছবি)
Sunday, April 7, 2019
কোরআনের আলোকে রোজাঃ
১) হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্যে সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা-২:১৮৩)
২) সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েক দিনের। তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে অথবা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূর্ণ করবে। এটা যাদের অতিশয় কষ্ট দেয় তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদইয়া-একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদান করা। যদি কেউ স্বা:স্ফূর্তভাবে সৎকাজ করে তবে তা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্যে অধিকতর কল্যাণকর যদি তোমরা জানতে। (সূরা বাকারা-২:১৮৪)
৩) রমাজান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কোরআন অবর্তীর্ণ হয়েছে।সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে এবং কেউ অসুস্থ্য থাকলে কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্যে যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্যে কষ্টকর তা চান না, এজন্যে যে তোমাদের সংখ্যা পূর্ণ করবে এবং তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মাহিমা ঘোষণা করবে এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। (সূরা বাকারাহ ২:১৮৫)
৪) সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্যে তোমাদের স্ত্রীদের বৈধ করা হয়েছে। তারা তোমাদের জন্যে এবং তোমরাও তাদের জন্যে পরিচ্ছদ। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের সাথে খিয়ানত করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদেরকে মার্জনা করেছেন, সুতরাং এখন তোমরা তাদের সাথে সংগত হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্যে যা নির্ধারণ করে রেখেছেন (অর্থাৎ সন্তান) তা অন্বেষণ করো। আর তোমরা আহার করো ও পান করো যতক্ষণ তোমাদের জন্যে (রাত্রির) কালো রেখা থেকে ফজরের সাদা রেখা স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। আর তোমরা মসজিদে ই’তিকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সংগত হয়ো না। এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা, সুতরাং এর নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্যে তার আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারে। (সূরা বাকারা ২:১৮৭)
কোরআনের আলোকে সালাতঃ
আল কুরআনের আলোকে সালাত
ভিডিও লিংকঃ
https://youtu.be/pLkozjUeis0
(Salaat)
https://youtu.be/0mYpmQQ_j4M
(Tasbih)
full salat video:
https://youtu.be/Cf5I9ZF-bW4
সূচনাঃ যারা কুরআনকে কিতাবুম মুবীন (সুস্পষ্ট কিতাব) ও ফুরকান (সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী) হিসাবে বিশ্বাস করেন, কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা গীতাতে থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য আর কুরআনের বিপরীত কথা সহীহ বুখারী হাদীস শরীফে থাকলেও তা মিথ্যা এ কথা যারা বিশ্বাস করেন তাঁদের জন্যই এ প্রবন্ধ। পৃথিবীর সকল মানুষও যদি আল্লাহকে সিজদা দেয় তাতেও আল্লাহর কোন লাভ নেই, আর সবাই যদি সমানে তাঁকে সিজদা দেয়া থেকে বিরত থাকে তাতেও তাঁর কোন ক্ষতি নেই। সুতরাং সালাতের বিধান হচ্ছে মানুষেরই কল্যাণের জন্য তাদেরকে আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকার প্রশিক্ষণমূলক বিধান। খাশেয়ীনদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে কিন্তু ছাহূনদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে ফেরায় না এবং তাদের সালাত সত্ত্বেও তারা জাহান্নামে যাবে (দ্র: সূরা মাউন/১০৭: ০৪-০৭)। তাই আমরা যদি খাশেয়ীন হই তথা আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখি তবে আমাদেরকে যাচাই করে দেখতে হবে ফুরকান বা সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী গ্রন্থ কুরআনের আলোকে সালাতের ওয়াক্ত ও কাঠামো কিরূপ। প্রচলিত ওয়াক্ত ও কাঠামো কুরআনসিদ্ধ না কুরআনের বিপরীত। যদি কুরআনের বিপরীত কথা মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহর নামে আমাদের কাছে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে তবু যখনি আমরা বুঝবো যে, কথাটি কুরআনবিরুদ্ধ তখনি আমরা বলে দেবো যে, কথাটি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ বলেননি। কারণ, অবশ্যই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ কুরআনের অনুসারী ছিলেন, তিনি কুরআনের লংঘনকারী ছিলেন না। যারা এ মানসিকতা অর্জন করতে পেরেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যেই এ প্রবন্ধ।
রাতদিনের সংজ্ঞাঃ প্রথমে রাতদিনের সংজ্ঞা বুঝে নিলে সালাতের বিষয়ে বুঝতে সুবিধা হবে। ফজর (ভোর) থেকে পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যাকালীন রক্তিমাভা বর্তমান থাকা পর্যন্ত সময় হচ্ছে দিন এবং এরপর থেকে ফজর শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় হচ্ছে রাত। প্রমাণস্বরূপ দেখুন-
‘তা (রাত) থাকে তুলুয়ে ফজর (ভোরের উদয়) পর্যন্ত’। (সূরা কদর/৯৭: ০৫)
‘না, আমি কসম করি সাফাকের (সন্ধ্যাকালীন রক্তিমাভার) এবং লাইলের (রাতের) এবং যা রাতে সমবেত হয় তার’। (সূরা ইনশিকাক/৮৪: ১৬-১৭)
সূরা ইনশিকাকের ১৬-১৭ নং আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, সাফাক (সন্ধ্যা) দিনের অংশ এবং এরপর থেকে লাইল বা রাত শুরু হয়। আবার, সূরা কদরের ০৫ নং আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, ফজর (ভোর) শুরু হলে লাইল বা রাত শেষ হয়ে যায় অর্থাৎ ফজর দিনের অংশ। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বেই দিন শুরু হয় এবং সূর্যাস্তের পরেও কিছুক্ষণ (সন্ধ্যা শেষ হওয়া) পর্যন্ত দিন বর্তমান থাকে।
কুরআনের আলোকে সূর্যোদয় হচ্ছে ‘তুলুয়ে সামস’, সূর্য ঢলে পড়া হচ্ছে ‘দুলুকে সামস’ এবং সূর্যাস্ত হচ্ছে ‘গুরুবে সামস’। সুতরাং কুরআনের আলোকে দিনকে চারভাগে ভাগ করা যায়, (১) ফজর বা প্রভাত (২) তুলুয়ে সামস থেকে দুলুকে সামস (৩) দুলুকে সামস থেকে গুরুবে সামস (৪) সাফাক বা সন্ধ্যা। আবার তুলুয়ে সামস থেকে গুরুবে সামস পর্যন্ত সময়কে ‘দুহা’ তথা ‘সূর্যের দীপ্তিকাল’ বলা হয়েছে। দিনকে বৃহত্তর দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- (১) ফজর থেকে দুলুকে সামস পর্যন্ত (২) দুলুকে সামস থেকে সাফাকের শেষ পর্যন্ত বা গাছাকিল লাইল (রাতের প্রাথমিক অন্ধকারের সমাচ্ছন্নতা) এর পূর্ব পর্যন্ত।
কুরআনের আলোকে সালাতের ওয়াক্তঃ
কুরআনে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয় সালাত মু’মিনদের উপর ওয়াক্ত ঠিক করা কিতাব বা বিধান হিসাবে বর্তমান বা বিধিবদ্ধ’। (সূরা নিসা/০৪: ১০৩)
(4:103)অতঃপর যখন তোমরা নামায সম্পন্ন কর, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন নামায ঠিক করে পড়। নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
সুতরাং কেউ যদি বলে যে, কুরআনে সালাতের ওয়াক্ত ঠিক করে দেয়া হয়নি বা কুরআনে সালাতের সব ওয়াক্ত উল্লেখ করা হয়নি বা কুরআনে উল্লেখকৃত ওয়াক্তের চেয়ে কম বা বেশি ওয়াক্তে সালাত সম্পন্ন করা ফরজ তবে অবশ্যই সে মিথ্যা বলে এবং কুরআনবিরোধী বা আল্লাহদ্রোহী কথা বলে এবং এমনকি যদি সে তা রসূলের নামে বলে তবে সে রসূলের ব্যাপারেও একটি মিথ্যাকে আরোপ করে মাত্র, অর্থাৎ সে এমন একটি বিষয়কে রসূলের নামে বলে যার সাথে রসূলের সম্পর্ক নাই।
এবার আমরা দেখবো, কুরআনে নামাজের যেসব ওয়াক্ত ঠিক করে দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ও পরিসীমা কী। এ বিষয়ে নিম্নের চারটি আয়াতে বিধান রয়েছে-
‘হিফাজাতকারী হও সালাতসমূহের উপর এবং সালাতিল উসতা (এর উপর হিফাযাতকারী হওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে)’। (সূরা বাকারা/০২: ২৩৮)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছ, যেন তোমাদের অনুমতি নেয় যারা তোমাদের ডান হাতের অধীনস্থ এবং তোমাদের মধ্য থেকে যারা এখনো বুদ্ধির পরিপক্কতার বয়সে পৌঁছেনি, তিনটি সময়। সালাতিল ফজরের আগে এবং যুহরে যখন তোমরা (বিশ্রামের জন্য) নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র শিথিল করে রাখো এবং সালাতিল ইশার পর’। (সূরা নূর/২৪: ৫৮)
‘একটি সালাত কায়িম কর ‘দুলুকিস সামসি ইলা গাছাকিল লাইল’ এর সময়কালে (অর্থাৎ সূর্য ঢলে পড়া থেকে রাতের প্রাথমিক অন্ধকার বা রাতের সূচনা পর্যন্ত সময়কালে)। আর ফজরে কুরআন পাঠ কর’। (সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ৭৮)
‘একটি করে সালাত কায়িম কর দিনের দুই তরফে (ভাগে) এবং (দিন শেষে) রাত থেকে (রাতের অন্তর্ভুক্ত) নিকটবর্তী সময়ে (তথা রাতের প্রথমাংশে/প্রথমার্ধে)’। (সূরা হূদ/১১: ১১৪)
আলোচনাঃ উপর্যুক্ত আয়াতসমূহ থেকে সালাতের ওয়াক্তসমূহ সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। সূরা বাকারার ২৩৮ নং আয়াতে ‘আস সালাওয়াত’ হিফাজাত করতে বলা হয়েছে, তারপর বিশেষভাবে ‘আস সালাতিল উসতা’ হিফাজাত করতে বলা হয়েছে। আরবীতে বচন তিনভাগে বিভক্ত- একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন। একবচনে ‘সালাত’, বহুবচনে ‘সালাওয়াত’। এখানে প্রথমে ‘সালাওয়াত’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। আরবীতে বহুবচন বলতে বুঝায় দুইয়ের বেশি তথা অন্তত তিন। তাহলে এখান থেকে আমরা প্রাথমিকভাবে বলতে পারি সালাতের ওয়াক্ত অন্তত তিনটি, এর চেয়ে কম নয়, বেশি হতে পারে কিনা তাও আমরা এ আয়াত থেকেও বুঝতে পারবো। এখানে দ্বিতীয় লক্ষ্য করার বিষয় হলো, দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘সালাতিল উসতা’ হিফাজাতের কথা বলা হয়েছে। ‘উসতা’ একটি আপেক্ষিক শব্দ, এর অর্থ ‘মধ্যবর্তী’। সুতরাং ‘সালাতিল উসতা’ মানে ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’। অর্থাৎ এর দুপাশে আরো অন্তত একটি করে সালাত আছে। বরং প্রকৃত কথা হচ্ছে এর দুপাশে আরো কেবলমাত্র একটি করে সালাত আছে। কারণ, সত্যিকারার্থে আরবীতে ‘উসতা’ শব্দটি দ্বারা তিনের মধ্যবর্তী বিষয়কে বুঝায়। কিন্তু যেহেতু হাদীস অনুযায়ী নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত তাই বর্তমানে ‘উসতা’ শব্দের ব্যাখ্যা কেউ কেউ এভাবে দেন যে, হাতের পাঁচ আঙ্গুলের মধ্যবর্তী আঙ্গুলটি উসতা আঙ্গুল। অর্থাৎ তাঁরা বলতে চান, উসতা বলতে পাঁচের মধ্যবর্তী বিষয়কে বুঝায়। আবার কেউ কেউ বলতে চান তিন থেকে শুরু করে যে কোন বেজোড় সংখ্যক বিষয়ের মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থিত বিষয়ই উসতা। যেমন পাঁচটি বিষয়ের ক্ষেত্রে তিন নং ক্রমিকের বিষয়টি উসতা, সাতটি বিষয়ের মধ্যে চার নং ক্রমিকের বিষয়টি উসতা ইত্যাদি। যেহেতু সালাতের ওয়াক্ত হবে পূর্ণসংখ্যা তাই উসতা শব্দটির কারণে একথা প্রমাণিত যে, সালাতের ওয়াক্তসংখ্যা দুইয়ের বেশি এবং অবশ্যই তা বেজোড় সংখ্যা। এখন সালাত যদি তিন ওয়াক্ত হয় তবে অন্য দুই ওয়াক্তের নাম অথবা যদি পাঁচ ওয়াক্ত হয় তবে অন্য চার ওয়াক্তের নাম আমরা কুরআনে পাবো। সুতরাং আমাদেরকে দেখতে হবে কুরআনে আর কোন কোন ওয়াক্তের বা কয় ওয়াক্তের নাম পাওয়া যায়। এছাড়া ‘সালাতিল উসতা’ বা ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’ এর সময়ও কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয় তাও কুরআন থেকে জানতে হবে।
এ আয়াতে আমরা আরো দুটি বিষয় লক্ষ্য করি, যা আমাদেরকে কুরআন থেকে সালাতের ওয়াক্ত জানার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। (১) ‘আস সালাত’ শব্দটি একবচন হলেও এ শব্দটি দ্বারা কুরআনে অনেক স্থানে সাধারনভাবে সালাতকে বুঝানো হয়েছে, কিন্তু এখানে বহুবচনে ‘আস সালাওয়াত’ শব্দটি উল্লেখ করায় এটি স্পষ্ট যে, সুনির্দিষ্ট পদাশ্রিত নির্দেশক (Definite Article) ‘আল’ ব্যবহার করে তারপর একবচনে ‘সালাত’ শব্দ ব্যবহার করলে সবসময় সাধারনভাবে সালাতকে বুঝানো হয় না, বরং ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে ‘আস সালাত’ দ্বারা একটিমাত্র (ওয়াক্তের) সালাতকে বুঝায়। কারণ, এখানে ‘আস সালাতিল উসতা’ তথা ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’ এর সাথে একই আয়াতে সালাতসমূহকে বুঝাতে গিয়ে ‘আস সালাত’ শব্দ ব্যবহার না করে বরং ‘আস সালাওয়াত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (২) আর এ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, একবচনের শব্দ ‘আস সালাতিল উসতা’ দ্বারা একটিমাত্র ওয়াক্তকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যবর্তী ওয়াক্তে তিনটি সালাত নয় বরং একটি সালাতই ফরজ।
সূরা নূরের ৫৮ নং আয়াতে আমরা সালাতের দুটি ওয়াক্ত সম্পর্কে জানতে পারি (১) সালাতিল ফজর (২) সালাতিল ইশা। সমগ্র কুরআনে সালাতের দৈনন্দিন ওয়াক্ত সম্পর্কে আমরা আর কোন ওয়াক্তের নাম পাই না। সুতরাং সমগ্র কুরআনে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে যার কুরআনিক নাম (১) সালাতিল ফজর (২) সালাতিল উসতা (৩) সালাতিল ইশা।
সালাতিল উসতা হচ্ছে ফজর ও ইশার মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত, এর সময়সীমা বলা হয়েছে সূরা বনী ইসরাইলের ৭৮ নং আয়াতে। তা থেকে আমরা জানি, সালাতিল উসতার সময় শুরু হয় দুলুকে সামস বা সূর্য হেলে পড়ার মাধ্যমে আর শেষ হয় গাছাকিল লাইল বা রাতের প্রাথমিক অন্ধকারের আগমন তথা সাফাকের (সন্ধ্যার) সমাপ্তির দ্বারা। বর্তমানে যে সময় লোকেরা যুহর, আসর ও মাগরিব সালাত সম্পন্ন করে এ পুরো সময়টা হচ্ছে কুরআনের আলোকে একটিমাত্র সালাতের সময়, সালাতিল উসতার সময়। কারণ, আয়াতে একবচনে আস সালাত কায়িম করতে তথা এ পুরো সময়টাতে একটিমাত্র সালাত কায়িম করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা সামান্য আগে জেনেছি ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে একবচনে ‘আস সালাত’ ব্যবহার করলে তা দ্বারা একটিমাত্র সালাত বুঝায়, সাধারনভাবে সালাত বুঝায় না। কারণ, যদি এক্ষেত্রে ‘আস সালাত’ দ্বারা সাধারনভাবে সালাত বুঝাতো তবে সূরা বাকারায় সালাতসমূহের কথা উল্লেখ করার জন্য ‘আস সালাওয়াত’ শব্দ ব্যবহার করা হতো না। তাই, ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে ‘আস সালাত’ বললে একটিমাত্র সালাতকে বুঝতে হবে, একাধিক সালাত নয়।
সূরা হূদের ১১৪ নং আয়াতে তিন ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ একই আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে। এখানেও ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে ‘আস সালাত’ কায়িম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ‘দিনের দুইভাগে এবং রাতের প্রথমভাগে’। যেহেতু এখানে তিনটি সময় সালাত কায়িম করার নির্দেশ তাই ‘আস সালাত কায়িম’ বলতে একটি করে সালাত কায়িম করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বক্তব্যের ভাব অনুযায়ী এখানে ‘একটি সালাত’ এর স্থলে অর্থ হবে ‘একটি করে সালাত’। এখন তিনটি সময়ে একটি করে সালাত কায়িম করার অর্থই হচ্ছে মোট তিন ওয়াক্ত সালাত কায়িম করা। দিনের প্রথম ভাগের সালাত হচ্ছে সালাতিল ফজর, দ্বিতীয় ভাগের সালাত হচ্ছে সালাতিল উসতা এবং রাতের প্রথমভাগের সালাত (রাতের ফরজ সালাত) হচ্ছে সালাতিল ইশা। কেউ কেউ আয়াতে ব্যবহৃত ‘তরফ’ শব্দের অর্থ করেন ‘প্রান্ত’ কিন্তু তা ‘তরফ’ শব্দের সঠিক অর্থ নয়। কারণ, কোন জিনিসের প্রান্ত কখনো দুইয়ের বেশি হয় না, এটি একটি চিরন্তন সত্য। আর কুরআনে ‘তরফ’ শব্দের দ্বিবচন ‘তরাফায়ি’ এবং বহুবচন ‘আতরফ’ ব্যবহৃত হয়েছে, তাই তরফ দুইয়ের বেশি হতে পারে, এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, তরফ অর্থ প্রান্ত নয় বরং তরফ অর্থ ভাগ। সুতরাং কুরআনে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের আলোকে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ, এর চেয়ে কমও নয়, বেশিও নয়। সালাতুল যুহর, সালাতুল আসর ও সালাতুল মাগরিবের নাম বা প্রসঙ্গ বা বিধান কুরআনে নেই। বিশেষত: সালাতুল আসর ও সালাতুল মাগরিব তো শব্দ হিসাবেই অগ্রহণযোগ্য। কারণ, সালাতুল আসর অর্থ মহাকালের সালাত, আর সালাতুল মাগরিব অর্থ সূর্যাস্তের দিকের (পশ্চিম দিকের) সালাত।
সালাতে স্বরের মাত্রাঃ সালাতে স্বরের মাত্রার বিষয়ে কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, সালাত সম্পন্ন করতে হবে মধ্যম স্বরে। এ বিষয়ে কুরআনের নির্দেশটি নিম্নরূপ-
‘তোমার সালাতে স্বর বেশি উঁচুও করো না আবার বেশি নিচুও করো না, বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী মাত্রা অবলম্বন করো (তথা মধ্যম স্বরে সালাত সম্পন্ন কর)’। (সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ১১০)
অথচ আমরা যদি কোন ওয়াক্তে সালাত জোরে আওয়াজ করে পড়ি, কোন ওয়াক্তে নিচু আওয়াজে পড়ি, অথবা কোন রাকায়াত জোরে আওয়াজ করে পড়ি আর কোন রাকায়াত নিচু আওয়াজে পড়ি তাহলে তা কি কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ লংঘন নয় তথা কুফরি নয়? প্রকৃত পক্ষে সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মধ্যম মাত্রার স্বরে পড়তে হবে।
সালাতে মুক্তাদীর স্বরের মাত্রাঃ সালাতে মুক্তাদী আস্তে বা জোরে সূরা ফাতিহা পড়বে কিনা এও এক বহুল বিতর্কিত বিষয় হিসাবে সমাজে বর্তমান। এ বিষয়ে কুরআনের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হচ্ছে যখন কারো সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তার কর্তব্য হচ্ছে মনোযোগ সহকারে শুনা ও চুপ থাকা। কি নামাজের ভিতরে কি নামাজের বাহিরে সবসময় আল্লাহর এ নির্দেশ পালন করতে হবে। সুতরাং ইমাম যখন কুরআন তিলাওয়াত করেন তখন মুক্তাদীর কর্তব্য তা মনোযোগ দিয়ে শুনা ও চুপ থাকা, সরবে বা নীরবে নিজেও তিলাওয়াত করা নয়। সুতরাং কেউ এর ব্যতিক্রম করলে সে কুরআনের পরিপন্থী কাজই করলো। আর কুরআনের এ নির্দেশের কারণে যারা একসাথে বসে প্রত্যেকে উচ্চ আওয়াজে কুরআন খতম বা কুরআন খানি করছে, তারা স্পষ্টত কুরআনের বিধানকে লংঘন করছে তথা কুফরি করছে। এ বিষয়ে কুরআনের আয়াতটি হচ্ছে-
‘যখন (তোমাদের সামনে) কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুন এবং চুপ থাক যাতে তোমাদেরকে রহম (অনুগ্রহদান) করা হয়’। (সূরা আ’রাফ/০৭: ২০৪)
সালাতের কসর কখনঃ সাধারনভাবে ধারনা করা হয় সফরে কসর করা বাধ্যতামূলক কোন ওজর থাকুক বা না থাকুক। আবার কতটুকু পথের সফরে কসর করতে হবে, কতদিনের সফরে কসর করতে হবে ইত্যাদি নানান কথা প্রচলিত আছে অথচ এর সবই কুরআনবিরোধী ধারনা। কারণ, কুরআনে কসরের জন্য সফরের পথের দৈর্ঘ্য বা সময়সীমার কোন শর্ত আরোপ করা হয়নি। অন্যদিকে, শুধুমাত্র কোনরূপ ক্ষতির আশংকাগ্রস্ত অবস্থায় সফরে কসর করার অনুমতি দেয়া হয়েছে, আদেশ নয়। অর্থাৎ যে সফরে কোনরূপ আশংকা নেই তাতে কসরের অনুমতি নেই। আর যে সফরে ক্ষতির আশংকা আছে তাতে কসরের অনুমতি আছে, আদেশ নয়। এরূপ সফরে কসর করলে গুনাহ হবে না, তা জানানো হয়েছে, কসরকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কসর সম্পর্কে কুরআনে যে আয়াতে অনুমতি দেয়া হয়েছে তা নিম্নরূপ-
‘যখন তোমরা পৃথিবীতে সফর করো তখন তোমাদের জুনাহ (গুনাহ) নেই, যদি তোমরা সালাতে কসর কর, যদি তোমরা ভয় কর যে, তোমাদেরকে ফিতনায় ফেলবে যারা কুফরি করেছে তারা, নিশ্চয় কাফিরগণ তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু’। (সূরা নিসা/০৪: ১০১)
আস সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআ এবং সালাত কাযা করাঃ আস সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআ বলতে বুঝায় জুমআর দিনের অন্তর্ভুক্ত একটি সালাত। অর্থাৎ জুমআর দিনের সব ওয়াক্ত সালাতই জুমআর সালাত নয়, বরং একটি ওয়াক্তের সালাত জুমআর সালাত। জুমআ থেকেই জামায়াত। সুতরাং সপ্তাহে একদিন এক ওয়াক্ত সালাত জামায়াতে কায়িম করা ফরজ। এছাড়া কুরআন থেকে বুঝা যায়, যে কোন সালাতই জামায়াতের সাথে পড়া উত্তম। আর জুমআর সালাতের জন্য নিদা (আহবান) করা প্রয়োজন, প্রতিদিনের সব ওয়াক্তের জন্য নিদা (আযান নয়) করার প্রয়োজন নেই। (কুরআন অনুযায়ী, নবীউল্লাহ ইবরাহীমকে হজ্জের জন্য আযান বা ঘোষনা দেয়ার আদেশ দেয়া হয়েছিল, সুতরাং তিনি তা করেছেন আর আল্লাহ সে ঘোষনার বিষয়টি আমাদেরকে কুরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং এখন আর আযানের প্রয়োজন নেই)। কুরআনে জুমআর সালাতের জন্য নিদা করার পর বিক্রয় তথা অন্য ব্যস্ততা বন্ধ করে আল্লাহর যিকরের দিকে দ্রুত চলে আসতে এবং সালাত কাযা করার পর আবার কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে আদেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং (১) জুমআর সালাত হচ্ছে এমন সময় যার আগে পরে মানুষ ব্যবসায় ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকে তথা জুমআর দিনের সালাতিল উসতাই জুমআর সালাত। (২) জুমআর সালাতের পর তথা জুমআর ফরজ সালাতের পর সুন্নাত সালাত নামে আলাদা সালাত পড়া কুরআনসিদ্ধ নয়, বরং জুমআর সালাতের পর কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে হবে। (৩) সালাত কাযা করার অর্থ যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করা এবং সালাত কাযা করার অর্থ কোনক্রমেই নির্দিষ্ট সময়ে সালাত না পড়ে অন্য সময়ে পড়া নয়। কুরআনে বকেয়া সালাত আদায়ের কোন বিধান নেই। সুতরাং কাযা নামাজ নামে বকেয়া সালাত আদায় একটি বিদআত। কুরআন অনুযায়ী যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করা ফরজ। যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করতে না পারলে তাওবা করতে হবে তথা অনুশোচনাবোধ থাকতে হবে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, সামনে আর এরূপ না করার সংকল্প করতে হবে এবং যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করার দিকে ফিরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, সালাত সম্পন্ন করার দ্বারা আল্লাহর কোন লাভ হয় না, বরং এটি আমাদেরকে ‘আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা ও অন্যায় ও অশ্লীল কাজের প্রতিরোধক প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম’ হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। জুমআর সালাত ও সালাত কাযা করার বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য নিম্নরূপ-
‘হে ঐসব লোক, যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, যখন সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআর জন্য নিদা (আহবান) করা হয়, তখন দ্রুত চলে আসো আল্লাহর যিকরের দিকে এবং ত্যাগ করো বিক্রয়, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জ্ঞানলাভ করো। আর যখন সালাত কাযা (যথাসময়ে সম্পন্ন) করো তখন কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর ফযল (অনুগ্রহ) সন্ধান কর এবং বেশি করে আল্লাহর যিকর (স্মরণ) কর যাতে তোমরা সফল হও’। (সূরা জুমআ/৬২: ০৯-১০)
সালাতের রাকায়াতঃ প্রথম কথা হলো রাকায়াত শব্দটি কুরআনিক পরিভাষা নয়। রাকায়াত শব্দটি এসেছে রুকু শব্দ থেকে। বুঝানো হয়, এক রুকুতে এক রাকায়াত। সাধারন ধারনা হচ্ছে প্রতি রাকায়াতে একটি রুকু ও দুইটি সিজদা করতে হয়। রুকু বলতে বুঝানো হয় দুই হাত হাঁটুতে রেখে অবনত হওয়া আর সিজদা বলতে বুঝানো হয় কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে অবনত হওয়া। রাকায়াত শব্দটি দ্বারা নামাজের ইউনিটকে বুঝানো হয়। এজন্য কুরআনের আলোকে আমরা সিজদা শব্দ ব্যবহার করতে পারি এবং প্রশ্নটা এভাবে সাজাতে পারি যে, সালাতে কয়টি সিজদা। আর বিষয়টি এরূপ যে, এক সিজদা বলতে এক ইউনিট বুঝবো। কুরআন থেকে জানা যায়, সালাতে দুইটি সিজদা অর্থাৎ দুইটি ইউনিট। প্রচলিত কথার সাথে মিল করে বললে বলতে হয় প্রত্যেক ওয়াক্তে দুই রাকায়াত সালাত আদায় করা ফরজ। অর্থাৎ দুইয়ের চেয়ে কম হবে না এবং দুইয়ের চেয়ে বেশিও হবে না। আর কসর সালাত হবে এক রাকায়াত তথা এক সিজদা বা এক ইউনিট। এ বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য নিম্নরূপ-
‘(কাফিরদের কর্তৃক ফিতনায় পড়ার আশংকাগ্রস্ত অবস্থায়) যখন তুমি (রসূল) তাদের মধ্যে থাক এবং তাদের জন্য সালাত কায়িম করো তখন তাদের মধ্য থেকে একদল যেন তোমার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা যেন তাদের অস্ত্র সাথে নিয়ে সতর্ক থাকে। তারপর যখন তারা সিজদা করে নেবে (একটি সিজদা দেবে) তখন তারা যেন তোমাদের পেছনে সরে যায়। আর আসবে অন্যদল যারা সালাত করেনি তখন তারা যেন তোমার সাথে সালাত করে। তারা যেন সতর্কতা অবলম্বন করে এবং সশস্ত্র থাকে, কাফিররা তো এ সুযোগই চায় যে, যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও মালসামানা থেকে অসাবধান হয়ে যাও তবে যেন তারা একসাথে তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। অবশ্য বৃষ্টির কারণে যদি তোমরা কষ্টকর মনে করো বা যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে পড় তাহলে অস্ত্র সরিয়ে রাখায় তোমাদের জুনাহ (গুনাহ) হবে না। তবে খুব সতর্ক হয়ে থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের জন্য অপমানজনক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন’। (সূরা নিসা/০৪: ১০২)
আলোচনাঃ এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে সফরে কাফিরদের ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার আশংকাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কসর করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ আয়াতে তারই ধারাবাহিকতায় সালাতে কসর করার পদ্ধতি এবং পূর্ণ সালাতের কাঠামো বলে দেয়া হয়েছে। এ আয়াতে একসাথে থাকা অবস্থায় জামায়াতে সালাতের নির্দেশ রয়েছে। তারপর যারা আশংকাগ্রস্ত তাদের সালাতে কসর করার পদ্ধতি বলা হয়েছে। এ আয়াত থেকে জানা যায়, সালাতের কাঠামো হচ্ছে কিয়াম (দাঁড়ানো) ও সিজদা (প্রণত হওয়া)। কিয়াম দ্বারা সালাত শুরু এবং সিজদা দ্বারা সালাত শেষ। তবে আয়াতটি থেকে জানা যায়, একদল এক সিজদা করছে এবং তারপর অন্যদল আসছে (এবং স্বাভাবিকভাবে তারাও প্রথম দলের মত এক সিজদাই করবে কারণ, তা না হলে দুই দলের এক দলের সালাত কসর হবে না বা স্বয়ং ইমাম যেহেতু উভয় দলের সাথে থাকছেন তাই তাঁর সালাত পূর্ণাঙ্গ হলে দুই দলের এক দলেরও সালাত পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না যেহেতু তারা কেউ পূর্ণ সময় ইমামের সাথে সালাত সম্পন্ন করছে না বরং অবশ্যই ইমামের সালাত তাদের উভয় দলের যৌথ সময়ের সমান কিন্তু একটি দলেরও হুবহু অনুরূপ নয়। তাই উভয় দলের সালাত কসর হওয়ার কারণে উভয় দলের সিজদার পরিমাণ পরস্পর সমান এবং ইমামের সিজদা হচ্ছে উভয় দলের যৌথ পরিমাণের সমসংখ্যক)।
যেহেতু ইমামের ওজর নেই, তাই ইমাম কসর না করে পূর্ণ সালাত সম্পন্ন করলেন আর দুই দল কসরের অনুমতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক সিজদা করে দেয়ার মাধ্যমে সালাত কসর করলেন। সুতরাং এ কথা সুস্পষ্ট যে, সালাতের কসর হলো এক সিজদা এবং সালাতের পূর্ণরূপ হলো দুই সিজদা। এ আয়াতে সালাত কসর করার পদ্ধতি এবং পূর্ণ সালাতের কাঠামো একসাথে বলে দেয়া হয়েছে, যেহেতু কুরআনে সালাতের পূর্ণ কাঠামো প্রদান করা প্রয়োজন ছিল তাই প্রসঙ্গক্রমে এখানে তা উপস্থাপিত হয়েছে।
এখানে ইমামের সালাত কসর হলে মুক্তাদীর সালাত অতিমাত্রার কসর হয় আর মুক্তাদীর সালাত কসরের যথাযথ রূপ হলে ইমামের সালাত কসর নয়। যেহেতু এ আয়াত ব্যতীত আর কোথাও কসরের ও পূর্ণ সালাতের রূপ উপস্থাপিত হয়নি, তাই অবশ্যই এ আয়াতে মুক্তাদীর সালাতই কসরের একমাত্র রূপ এবং ইমামের সালাতই পূর্ণ সালাতের একমাত্র রূপ।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে, এ আয়াতে সালাত কসর করার জন্য এক সিজদার কথা কিভাবে জানা গেল? এর জবাব হচ্ছে, যেহেতু আয়াতটিতে বলা হয়েছে ‘যখন তারা সিজদা করে নেবে তখন তারা যেন তোমাদের পিছনে সরে যায়’। আর ‘সিজদা করে নেবে’ দ্বারা একটি সিজদা দেয়াকেই বুঝায়, কারণ, একাধিক সিজদার বিষয় হলে তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকতো, এটাই আরবী ভাষার বাকরীতি, তাই এখানে আলাদাভাবে সিজদার দ্বিবচন বা বহুবচন ব্যবহৃত না হওয়ায় এখানে একটি সিজদার আদেশ রয়েছে বলে প্রমাণিত। সুতরাং কসর সালাতে একাধিক সিজদা দেয়া যাবে না এবং পূর্ণ সালাতে দুইয়ের চেয়ে কম বা বেশি সিজদা দেয়া যাবে না।
রুকুঃ রুকু সম্পর্কে বুঝার জন্য প্রথমে অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হচ্ছে। কুরআনে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয় মু’মিনরা সফলতা লাভ করেছে যারা তাদের সালাতে খাশিয়ূন বা খুশুকারী’ (সূরা মু’মিনূন/২৩: ০১-০২)। যারা খুশু করে তাদেরকে বলে খাশিয়ূন, তদ্রুপ যারা রুকু করে তাদেরকে বলে রাকিয়ূন। এখন সালাতে খুশু করার কথা কুরআনে থাকা সত্ত্বেও খুশু করার জন্য কি কোন কাঠামো অবলম্বন করা হয়? হয় না। কেন? কারণ, সবাই জানে, খুশু হচ্ছে মনের ব্যাপার বা একটি মনোভাব। আসলেও তাই। কুরআনে খাশিয়ূনের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে- যারা আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখে। অর্থাৎ আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিই খুশু। আয়াতটি হচ্ছে- ‘সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও, নিশ্চয় উহা বড় ধরনের (কষ্টকর) বিষয়, কিন্তু তাদের জন্য নয় যারা খাশিয়ীন। যারা ধারণা রাখে যে, তাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হবে তাদের রবের সাথে এবং তারা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’ (সূরা বাকারা/০২: ৪৫-৪৬)। রুকুও খুশুর মত একটি মনোভাব। রুকু শব্দের অর্থ মানসিকভাবে ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা। এই ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা যে মানসিক বিষয় বা একটি মনোভাবকে প্রকাশ করে তার প্রমাণ হচ্ছে নিম্নের আয়াতসমূহ-
‘নিশ্চয় মু’মিনদের ওলী হচ্ছেন আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এবং যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছে, যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত নিশ্চিত করে এ অবস্থায় যে তারা রাকিয়ূন/রুকুকারী’। (সূরা মায়িদা/০৫: ৫৫)।
আলোচনা: এ আয়াত থেকে জানা যায়, রুকু এমন একটি বিষয় যা শুধু সালাতে নয়, যাকাতেও থাকতে হয়। বক্তব্যের ধরন থেকেই বুঝা যায় রুকু বলতে একটি মানসিক অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যে মনোভাব না থাকলে সালাত এবং যাকাত গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ রুকু হচ্ছে সালাত ও যাকাতের প্রাণসত্তা যা ব্যতীত সালাত ও যাকাত নিছক বাহ্যকাঠামো মাত্র, প্রকৃত কোন ইবাদাতে পরিণত হয় না। রুকু শব্দের অর্থ ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা, আর এখানে এ কথা স্পষ্ট যে, এ ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা বলতে মানসিকভাবে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত থাকাকে বুঝানো হয়েছে।
‘(বিবাদের বিবরন শুনে) সে (দাউদ) বললো, এ ব্যক্তি তোমার দুম্বাটি তার দুম্বাগুলোর সাথে দাবি করে তোমার উপর জুলুম করেছে। নিশ্চয় যারা একসাথে বাস করে তারা অনেক সময় একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করে। তবে শুধু তারাই এ থেকে বেঁচে থাকে যারা ঈমান (বিশ্বাস) করে ও আমলে সালিহাত করে। আর এমন লোক কমই হয়। (এ কথা বলতে বলতেই) দাউদ ধারনা করলো যে, আমি আসলে তাকে এক পরীক্ষায় ফেলেছি। তখন তিনি তাঁর রবের কাছে মাফ চাইলেন এবং রুকুতে (আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঝুঁকে যাওয়ার মনোভাবে) নিবিষ্ট হলেন এবং তাঁর দিকে এসে গেলেন’। (সূরা সোয়াদ/৩৮: ২৪)
আলোচনা: এ আয়াত থেকে জানা যায়, নবীউল্লাহ দাউদ যখন বুঝতে পারলেন তিনি একটি পরীক্ষায় পড়ে গেছেন তখন তিনি আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেন এবং রুকুতে নিবিষ্ট হলেন। প্রচলিত অনেক অনুবাদে এখানে লেখা হয়েছে তিনি সিজদায় ঝুঁকে পড়লেন। অথচ আয়াতে আছে রুকু, অনুবাদে রুকুর বদলে সিজদা শব্দের প্রয়োগ একটি অনধিকার চর্চা। যদি সিজদা-ই হতো তবে আল্লাহ কি সিজদা শব্দ প্রয়োগ করতে পারতেন না? তাহলে এটা নিশ্চিত যে, রুকু অর্থ রুকু, সিজদা নয়। এখন, প্রশ্ন হলো, রুকু বলতে যদি তা-ই বুঝায় যা বর্তমানে প্রচলিত ধারনা যে, দুই পায়ের হাঁটুতে দুই হাতের কবজি রেখে সামনে ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা তাহলে, প্রশ্ন হলো, কেন দাউদ সিজদা না করে রুকু করলেন? তিনি যদি সিজদা করতেন তবে তাতেই কি অধিকতর বিনয় প্রকাশ করা হতো না? আসলে দাউদ মানসিকভাবে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে গেলেন এটাই এ আয়াত থেকে বেশি স্পষ্ট হয়।
‘সালাত কায়িম করো, যাকাত নিশ্চিত করো এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো’। (সূরা বাকারা/০২: ৪৩)
আলোচনা: এ আয়াতকে অনেকে জামায়াতে নামাজ পড়ার দলীল হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। অথচ আমরা আগেই দেখেছি রুকু শুধু নামাজের অংশ নয়, বরং রুকু এমন একটি বিষয় যা সালাত ও যাকাত উভয়টির মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকতে হয়। রুকুকারীদের সাথে রুকু কর কথাটি এভাবে বলা হয়েছে ‘ওয়ারকাউ মায়ার রাকিয়ীন’। ‘মায়া’ অর্থ ‘সাথে’। এই সাথে বলতে সত্তাগতভাবে সবাই পাশাপশি দাঁড়িয়ে সাথে হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা বুঝায় না। যেমন, বলা হয়েছে, ‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরা সবর ও সালাতের দ্বারা (আমার কাছে) সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন’ (সূরা বাকারা/০২: ১৫৩)। এখানে আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন কথাটি এভাবে বলা হয়েছে ‘ইন্নাল্লাহা মায়াস সাবিরীন’। এখানে আল্লাহ সত্তাগতভাবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলা হয়নি, বরং তিনি সবরকারীদেরকে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। তদ্রুপ, রুকুকারীদের সাথে রুকু করার জন্য কোন আনুষ্ঠানিকতা অপরিহার্য নয়। বরং যারা রুকু করে তাদের সহযোগী হয়ে রুকু করা অর্থাৎ যারা রুকু করে তাদের সহযোগীও হওয়া আবার নিজেরাও রুকু করার কথা বুঝানো হয়েছে। একই বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রকাশকারী আরো দুটি আয়াত হচ্ছে-
‘আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং ফিরকাবাজি করো না’। (সূরা আলে ইমরান/০৩: ১০৩)
‘আল্লাহ পছন্দ করেন তাদেরকে যারা যুদ্ধ করে তাঁর পথে সফ বা সারিবেঁধে যেন তারা বুনইয়ানুম মারসুস বা সীসাঢালা প্রাচীর’। (সূরা সফ/৬১: ০৪) । (দ্র: এখানে সফ বা সারি কথাটি আক্ষরিক অর্থে নয়, কারণ, আক্ষরিক অর্থে সফ বা সারি বেঁধে থাকলে যুদ্ধ করা যায় না) ।
‘ঐ সময়ের কথা উল্লেখ্য যখন আমি ইবরাহীমকে এ (কা’বা) ঘর নির্মাণের জন্য স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম এ নির্দেশনা সহকারে যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না, আর আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাদের জন্য যারা তায়িফীন ও কায়িমীন এবং রুককায়ী (রুকুকারী), সুজুদ (সিজদাকারী)’। (সূরা হজ্জ/২২: ২৬)
আলোচনা: এ আয়াতের ‘কায়িমীনা ওয়া রুককায়ীস সুজুদ’ অংশ থেকে ধারনা হতে পারে যে, সালাতে মৌলিক কাঠামো তিনটি কিয়াম-রুকু-সিজদা। কিন্তু আসলে এখানে এ তিনটি বিষয় দ্বারা সালাত বুঝানো হয়েছে এটি সুনির্দিষ্ট নয়। বিশেষত: কায়িমীন শব্দের আগে আছে ‘তায়িফীন’ যার অর্থ ‘যাতায়াতকারী’ আর এখানে এর অর্থ ‘কা’বায় যাতায়াতকারী’। আর ‘কায়িমীন’ শব্দ দ্বারা শুধু সালাতে দাঁড়ানো লোকদেরকেই বুঝায় না এবং রুকুও শুধু সালাতের অংশ নয় যা আমরা আগেই দেখেছি সূরা মায়িদার ৫৫ নং আয়াতে। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে আরো ভাবার অবকাশ আছে এবং আমরা কুরআন থেকেই এর অর্থ নির্ণয় করা সম্ভব। কুরআনে কায়িমুন (দ্র: কায়িমুন ও কায়িমীন একই শব্দের দুই রূপ) এবং এরই একটি ব্যঞ্জণা প্রকাশকারী রূপ ‘কাওয়ামীন’ শব্দ ধারনকারী আয়াতগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
‘(নৈতিক বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হচ্ছে তারা) যারা তাদের সাহাদাতের (সাক্ষ্যদানের) প্রতি কায়িমুন (সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত) এবং যারা তাদের সালাতের উপর হিফাজাতকারী’। (সূরা মাআরিজ/৭০: ৩৩-৩৪)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, ন্যায়বিচারের দ্বারা কাওয়ামীন (সুপ্রতিষ্ঠিত) হয়ে যাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হিসাবে যদিও তা যায় তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে এবং তোমাদের আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে, সে ধনী হোক বা গরীব হোক (তা বিবেচনার বিষয় নয়), তোমরা তাদের উভয়ের যতটুকু হিতকামী আল্লাহ তাদের উভয়ের প্রতি তার চেয়ে বেশি হিতকামী। সুতরাং আদল (ন্যায়বিচার) করার কাজে হাওয়া বা প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ো না। যদি তোমরা পেঁছালো কথা বলো বা সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ তো তোমরা যা কর তার খবর রাখেন’। (সূরা নিসা/০৪: ১৩৫)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, ন্যায়বিচারের দ্বারা কাওয়ামীন (সুপ্রতিষ্ঠিত) হয়ে যাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হিসাবে, কোন কাওমের সাথে শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এমন অপরাধপ্রবন না করে যে, তোমরা আদল (ন্যায়বিচার) করতে পারো না। ন্যায়বিচার করো। উহাই তাকওয়ার নিকটতম। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন’। (সূরা মায়িদা/০৫: ০৮)
এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, কায়িমুন বলতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা লোকদেরকে বুঝায়। এছাড়া সূরা হাজ্জের ২৬ নং আয়াতে নবীউল্লাহ ইবরাহীমকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে নির্দেশ সূরা বাকারার ১২৫ আয়াতে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
‘আমি ইবরাহীম ও ইসমাইলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে পবিত্র রাখে তাদের জন্য যারা তায়িফীন ও আকিফীন এবং রুককায়ী (রুকুকারী) সুজুদ (সিজদাকারী)’। (সূরা বাকারা/০২: ১২৫)
এ আয়াতে পূর্বোক্ত আয়াতের কায়িমীন এর স্থানে আকিফীন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং কায়িমীন ও আকিফীন বলতে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তায়িফীন হচ্ছে যারা হাজ্জ বা উমরার সময় কা’বা তাওয়াফ করে তথা কা’বা প্রাঙ্গনে যাতায়াত করে। আকিফীন বলতে বুঝানো হয় যারা মাসজিদে এ’তেকাফ (অবস্থান) করে তাদেরকে, এর প্রমাণ হচ্ছে নিম্নের আয়াত-
‘তোমরা তোমাদের বিবিদের সাথে দেহসম্ভোগে মিলিত হয়ো না, যখন তোমরা মাসজিদে আকিফূন থাকো’। (সূরা বাকারা/০২: ১৮৭)
কায়িমূন এবং আকিফূন শব্দ একই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করার কারণে এ কথা স্পষট যে, মাসজিদ তথা কুরআনিক সমাজব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে অবস্থান করে বা প্রতিষ্ঠিত থেকে যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিবর্গ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কুরআনের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে দায়িত্ব পালন করেন তাঁরাই কায়িমীন বা আকিফীন। কা’বা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় মাসজিদ। এখান থেকে যাঁরা কুরআনিক বিধানসমূহ কার্যকরী করার কাজে ভূমিকা পালন করেন তাঁরাই কা’বার সাপেক্ষে কায়িমীন ও আকিফীন। আর সমগ্র বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর যে সব সদস্য হাজ্জ বা উমরার সময় কা’বায় যাতায়াত করেন তাঁরা তায়িফীন। কুরআনে আকিফীনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যখন তাঁরা আকিফীন হিসাবে দায়িত্ব পালনের স্বার্থে মাসজিদে অবস্থান করেন ঐ সময় তথা মাসজিদের ভিতরে তাঁরা যেন স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন।
এরপর থাকে রুকুকারী ও সিজদাকারী প্রসঙ্গ। রুকুকারী বলতে যারা মানসিকভাবে আল্লাহর বিধানের প্রতি ঝুঁকে থাকে এবং সিজদাকারী বলতে যারা তাদের আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি প্রণত হয় তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রুকুকারী ও সিজদাকারী বলতে তায়িফীন ও আকিফীনদেরকে আরো দুটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিজদাঃ সিজদার প্রকৃতি বুঝার জন্য নিম্নে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল-
‘নক্ষত্র এবং গাছ (আল্লাহকে) সিজদা করে’। (সূর আর রহমান/৫৫: ০৬)
আলোচনা: এখান থেকে বুঝা যায়, সিজদা হচ্ছে আল্লাহর বিধান অনুসারে কর্মতৎপর থাকা।
‘তাদের (মুহাম্মাদ ও তার নিষ্ঠাবান সাথীদের) চেহারায়/মুখে/ব্যক্তিত্বে সিজদার চিহ্ন/আলামত রয়েছে’। (সূরা ফাতহ/৪৮: ২৯)
আলোচনা: এখানে সিজদা অর্থ আনুষ্ঠানিক সিজদা নয়, কারণ তাহলে চেহারা বলতে কপাল বুঝালে এ আয়াতের আলোকে নিজেকে নিষ্ঠাবান প্রমাণ করার স্বার্থে মোনাফেকও সিজদা করার সময় কপালকে মাটিতে ঘষে চিহ্ন তৈরি করতে পারবে। বরং এখানে চেহারায় সিজদার আলামত বা চিহ্ন বলতে বুঝানো হয়েছে আল্লাহর প্রতি প্রণত থাকার কারণে তাদের চেহারায় একটা দীপ্তি থাকে যা থেকে বুঝা যায় তারা সৎমানুষ অর্থাৎ তাদের চেহারায় তাদের জীবনপদ্ধতির পবিত্রতার ছাপ থাকে। সুতরাং এ আয়াতে সিজদা বলতে বাস্তব কাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি প্রণত থাকার কথা বুঝানো হয়েছে, কোন আনুষ্ঠানিক সিজদামাত্রকে বুঝানো হয়নি, তবে এর মানে এ নয় যে, তারা আনুষ্ঠানিক সিজদা দেয় না, বরং তারা শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব নয় এ কথাটিই এ আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য।
‘আর সে (ইউসুফ) তার পিতামাতাকে আরশে (আসনে) উন্নীত করলেন (উর্ধ্বে স্থাপিত আসনে বসালেন)। আর তারা (ইউসুফের পিতামাতা ও ভাইগণ) তার উদ্দেশ্যে সিজদায় প্রবৃত্ত হলো’। (সূরা ইউসুফ/১২: ১০০)
আলোচনা: এ আয়াত অনুযায়ী কাউকে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করলে তাও সিজদা। অর্থাৎ সিজদা বলতে বুঝায়, কোন ঊর্ধ্বতন বা শ্রেষ্টত্বপূর্ণ সত্তার উদ্দেশ্যে প্রণত হওয়া, আনুষ্ঠানিকভাবেও এ প্রণত হওয়াকে প্রদর্শন করা যেতে পারে।
‘(হূদহূদ আরো বললো যে,) আমি দেখলাম যে, সে (সাবার রাণী) ও তার কাওম আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যকে সিজদা করে। আর শয়তান তাদের আমলকে তাদের চোখে সুন্দর করে দেখাচ্ছে এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। তাই তারা হিদায়াত পায় না’। (সূরা নামল/২৭: ২৪)
‘আর সূর্য ও চাঁদকে সিজদা করো না বরং আল্লাহকে সিজদা করো যিনি ঐগুলিকে সৃষ্টি করেছেন যদি তোমরা একান্তভাবে তাঁরই ইবাদাত করতে চাও’। (সূরা হামীম/৪১: ৩৭)
আলোচনা: সূর্য ও চাঁদ বস্তুসত্তা তাই এসব কোন আদেশ দিতে পারে না, সুতরাং এসবে সিজদা করার অর্থ এসবের আদেশ মান্য করা হতে পারে না বরং এর অর্থ হচ্ছে এসবের প্রতি কোন বাহ্যিক কাজের মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করা। আর এরূপ কোন বাহ্যিক কর্মকান্ড দেখে হুদহুদ বুঝতে পেরেছে যে, সাবাবাসী সূর্যকে সিজদা করছে। যাই হোক, এ আয়াত থেকেও বুঝা যায়, সিজদার আনুষ্ঠানিক রূপ রয়েছে।
‘যেদিন কঠিন সময় আসবে এবং সিজদা করার জন্য ডাকা হবে সেদিন এসব লোক সিজদা করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি নত থাকবে, অপমান তাদের উপর ছেয়ে থাকবে। আর নিশ্চয় (পৃথিবীতে) সুস্থ থাকা অবস্থায় তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান করা হয়েছিল (আর তারা তা করেনি)’। (সূরা কলম/৬৮: ৪২-৪৩)
‘তুমি যদি ঐসময় দেখ যখন অপরাধীরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাদের রবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। (তখন তারা বলতে থাকবে) হে আমাদের রব, আমরা খুব দেখলাম ও শুনলাম। এখন আমাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দাও, আমরা নেক আমল করবো। এখন আমাদের ইয়াকীন এসে গেছে’। (সূরা সিজদা/৩২: ১২)
আলোচনা: এ আয়াতদুটি থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, সিজদার একটি আনুষ্ঠানিক রূপ আছে আর তা অবশ্যই শুধু দৃষ্টি নিচু করা বা মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, কারণ, যদি তা হতো তবে তা করা সত্ত্বেও অপরাধীরা সিজদা করতে পারবে না কথাটি অর্থবহ হতো না। আসলে সামান্য কুর্নিশ করা তো সাধারণভাবে কারো উদ্দেশ্যে সিজদা বলে গণ্য হতে পারে, যেমন ইউসুফের উদ্দেশ্যে সিজদাটি হয়তো এরুপ ছিল, কিন্তু আল্লাহ যেহেতু পরম সত্তা সেহেতু তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা হবে পরমভাবে প্রণত হওয়া। তাই সামান্য মাথা ঝুঁকানো তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা হিসাবে যথেষ্ট নয়।
বর্তমানে যেভাবে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সিজদা দেয়া হয় তা সিজদার একটি গ্রহণযোগ্য রূপ। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ কুরআনে এ রূপটিকে নির্দিষ্ট করে দেননি তাই কেউ যদি বর্তমানে যেটিকে রুকু বলে এরূপভাবে ঝুঁকে তবে তাও সিজদা বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ আল্লাহ যা নির্দিষ্ট করে দেননি, আমরা তা নির্দিষ্ট করে দিতে পারি না। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ভুলে যাননি আর তিনি আমাদেরকে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্যে ফেলতে চাননি। তাই তিনি যা অনির্দিষ্ট রেখেছেন তা অনির্দিষ্টই তাকে অন্য কেউ সুনির্দিষ্ট করে দিতে পারে না, কারণ, বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ, আর তাঁর কোন শরীক নেই।
সিজদা কখনঃ কুরআন তিলাওয়াতের পর সিজদা দিতে হবে। কুরআনের কয়েকটি নির্দিষ্ট আয়াত (যেমন বলা হয় কুরআনের ১৪ বা ১৫ টি আয়াত এমন আছে যা) তিলাওয়াতের পর সিজদা দিতে হবে কথাটি কুরআনসিদ্ধ নয়, আর সিজদার জন্য কুরআন কয়েকটি আয়াতকে আলাদা করে দেয়নি। বরং কুরআনের আলোকে যখনই কুরআন থেকে কোন অংশ তিলাওয়াত করা হবে তখন তিলাওয়াত শেষে সিজদা করতে হবে। এ বিষয়ে কয়েকটি আয়াত নিম্নে দেয়া হল-
‘(তাদের কি হয়েছে যে,) যখন তাদের সামনে কুরআন পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদা করে না?’ (সূরা ইনশিকাক/৮৪: ২১)
‘আমার আয়াতসমূহের উপর তারাই ঈমান (বিশ্বাস) রাখে যাদেরকে তার দ্বারা যিকর (উপদেশ প্রদান) করলে তারা তখন সিজদায় ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের রবের হামদসহ তাসবীহ করে এবং তারা কোন বড়াই করে না’। (সূরা সাজদাহ/৩২: ১৫)
‘সকলে সমান নয়। আহলি কিতাব এর মধ্যে একটি দল আছে যারা সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। তারা রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করে এবং সিজদা করে’। (সূরা আলে ইমরান/০৩: ১১৩)
উপর্যুক্ত আয়াতসমূহ থেকে জানা যায়, আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াতের পরবর্তী কাজই হলো সিজদা।
সালাতের ধারাক্রম ও করণীয়ঃ সালাতে রুকু ও খুশু থাকতে হবে এবং এ দুটি হচ্ছে মনোভাবের বিষয়। আর সালাত শুরু হবে দাঁড়িয়ে এবং শেষ হবে সিজদার মাধ্যমে। সালাতে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে আর সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ করতে হবে। সিজদার মাধ্যমে সালাত শেষ তবে সিজদার পরেও তাসবীহ করতে হবে। নিম্নে এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল-
‘(হে রসূল) তোমার রব জানেন যে, তুমি কখনো রাতের প্রায় তিনভাগের দুইভাগ, কখনো আধারাত এবং কখনো তিনভাগের একভাগ রাত (সালাতে) দাঁড়িয়ে থাক। তোমার সাথীদের মধ্যেও একদল (এ কাজ করে)। আল্লাহই রাত ও দিনের সময়ের সঠিক হিসাব রাখতে পারেন। তিনি জানেন যে, তোমরা সময়ের সঠিক হিসাব রক্ষা করতে (সময়ের নিখুঁত হিসাব অনুযায়ী কাজ করতে) পারো না। সুতরাং তিনি তোমাদের প্রতি রহমতের খেয়াল করলেন। কুরআন ততোটুকু পাঠ করো যতটুকু সহজে পাঠ করতে পার’। (সূরা মুজজামমিল/৭৩: ২০)
তিলাওয়াতের পর সিজদা করতে হবে (দ্র: সূরা ইনশিকাক/৮৪: ২১, সাজদাহ/৩২: ১৫, আলে ইমরান/০৩: ১১৩)
সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ করতে হবে (দ্র: সূরা সাজদাহ/৩২: ১৫)
সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ এর একটি উদাহরণ- সুবহানা রব্বিনা, ইন কানা ওয়া’দু রব্বিনা লামাফউলা- আমাদের রব পবিত্র। যদি কোন বিষয়ে আমাদের রবের কোন ওয়াদা থাকে তবে তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবেই’ (দ্র: সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ১০৮)
এছাড়া সালাতের প্রধান বিষয়ই হচ্ছে আল্লাহর যিকর (দ্র: সূরা ত্বাহা/২০: ১৪) এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা (দ্র: বাকারা/০২: ৪৫, ১৫৩)।
সিজদার পরেও তাসবীহ করতে হবে (দ্র: সূরা কাফ/৫০: ৪০)।
শাহাদাঃ
3:18 شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ আরবি উচ্চারণ ৩.১৮। শাহিদাল্লা-হু আন্নাহূ লায় ইলাহা ইল্লা-হুঅ অল্মালা - য়িকাতু অ ঊলুল্ ‘ইল্মি ক্বা - য়িমাম্ বিল্ ক্বিস্ত্ব্; লায় ইলা-হা ইল্লা-হুঅল্ ‘আযীযুল্ হাকীম্। বাংলা অনুবাদ ৩.১৮ আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা এবং জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দেয়। তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবুদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আততাহিয়্যাতু প্রসঙ্গঃ তাহিয়্যাত অর্থ ‘কারো হায়াতের জন্য শুভ কামনা’। তাহিয়্যাতের একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সালাম’। কুরআনে সূরা নিসার ৮৬ আয়াতে তাহিয়্যাতের বিষয়ে বলা হয়েছে-
‘যখন কেউ তোমাদেরকে তাহিয়্যাত (বা সালাম) করে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম বা অন্তত অনুরূপভাবে তাকে তাহিয়্যাত (বা সালাম) করো। আল্লাহ অবশ্যই প্রতিটি বিষয়ে হিসাব নেবেন’। (সূরা নিসা/০৪: ৮৬)
কুরআনের কোথাও আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাতের কথা বলা হয়নি, আর বাস্তবে আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাত হতে পারে না। আল্লাহর জন্য হতে পারে হামদ ও তাসবীহ। আততাহিয়্যাতু লিল্লাহ তথা আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাত বলা একটি শিরক। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে-
‘রসূলদের জন্য সালাম আর আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য হামদ’। (সূরা সাফফাত/৩৭: ১৮১-১৮২)
দরুদ প্রসঙ্গঃ যে আয়াতের দোহাই দিয়ে দুরুদ পড়া হয় তা হচ্ছে-
‘আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত করেন। হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত করো ও শান্তিশীল পরিবেশ বজায় রাখ’। (সূরা আহযাব/৩৩: ৫৬)
এ আয়াতে সালাত শব্দকে অনেকে দুরুদ শব্দ দিয়ে অনুবাদ করেন। আমরা ঐ অনুবাদকে সমর্থন করি না। আয়াতে বলা হয়েছে সালাত। সালাত শব্দের অর্থ সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ। সালাত আল্লাহ করেন মু’মিনদের প্রতি যা উল্লেখ থাকা একটি আয়াত হচ্ছে-
‘তিনি (আল্লাহ) ও তাঁর ফেরেশতারা তোমাদের (মু’মিনদের) প্রতি সালাত করেন। যাতে তিনি তোমাদেরকে অন্ধকারসমূহ থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন। তিনি মু’মিনদের প্রতি বড়ই মেহেরবান’। (সূরা আহযাব/৩৩: ৪৩)
সালাত মু’মিনরা করবে রসূলের প্রতি বা তাদের পরস্পরের প্রতি। তাহলে সালাত হলো সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ, আর মনিবের প্রতি গোলামের এবং গোলামের প্রতি মনিবের সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণে প্রকৃতিগত পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা প্রতিদিন যে তিন ওয়াক্ত সালাত কায়িম করি এটা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আনুষ্ঠানিক সালাত।
যাই হোক, রসূলের প্রতি সালাত অর্থ যদি দুরুদ হয়, প্রথম প্রশ্ন হলো, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা যে দুরুদ পড়েন তা কোনটি? আর আল্লাহ তাঁর প্রতি দুরুদ পড়ার দরকারটাই বা কি? আসলে সালাত অর্থ দুরুদ নয়। যে আয়াতে রসূলের প্রতি সালাত করতে বলা হয়েছে তার পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রসূলের ঘরে প্রয়োজনে বা কম প্রয়োজনে ঘন ঘন যাতায়াত, খাওয়ার জন্য বসে থাকা, খাওয়া শেষেও বসে থাকা সাহাবীদের ইত্যাদি যেসব আচরণ রসূলের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা প্রতিরোধ করার জন্য কিছু বিধান দেয়া হয়েছে। তারপর তাঁর প্রতি সালাত করতে বলা হয়েছে। জীবিত রসূলের প্রতি সালাত করা তথা যা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক না হয়ে স্বস্তিদায়ক হবে এমন আচরণ করা সম্ভব। কিন্তু তাঁর ওফাতের তাঁর শান্তি আমাদের দুআর ওপর নির্ভর করতে পারে না, আর এজন্য আমাদের দোআর কোন প্রয়োজনই হতে পারে না। কারণ তাঁর শান্তি যদি আমাদের দোআর উপর নির্ভরশীল হয় তার মানে হয় আমরা বেশিজনে বা বেশিবার দোআ করলে তিনি বেশি শান্তি পাবেন আর কমজনে বা কমবার দোআ করলে তিনি কম শান্তি পাবেন। এটা যে কত অযৌক্তিক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫৩ নং আয়াতে যেমন নবীর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীদেরকে বিয়ে না করার নির্দেশ একটি যথার্থ নির্দেশ কিন্তু নবীর স্ত্রীদের ওফাতের মাধ্যমে এ নির্দেশের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিসত্তার অনুপস্থিতি দেখা দেয়ায় নির্দেশ লংঘন করা না করার ক্ষেত্র নেই তেমনি এ আয়াতে রসূলের প্রতি সালাত করার নির্দেশ রসূলের ওফাতের পূর্ববর্তী পর্যায়ের সমকালীন মু’মিনদের সাথে সম্পর্কিত। বর্তমানে তাঁর নামে দুরুদ পড়ার কোন মানে নেই।
সাধারণত নামাজে যে দুরুদটি পড়া হয় এতে স্পটত কুফরি হয়। কারণ, সূরা বাকারার ২৮৫ আয়াতসহ অনেক আয়াতে নবী ও রসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করাকে কুফরি হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। একটি আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ নবীদের একজনের উপর অন্যজনকে বিশিষ্টতা দিয়েছেন। এটি আল্লাহর নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু আমাদের প্রতি নির্দেশ হলো আমরা নবীদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবো না। বিশেষ করে, কুরআনে বলে দেয়া নাই যে, আল্লাহ অমুক নবীর চেয়ে অমুক নবীকে বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। বরং বলা আছে সকল নবীর ক্ষেত্রে আল্লাহর সুন্নাত একই রকম এবং মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহকে বলা হয়েছে যে, তিনি যেন বলে দেন যে, তিনি রসূলদের মধ্যে বিদআ (ভিন্ন নীতিভুক্ত, নতুন কোন ব্যাপার দ্বারা সংশ্লিষ্ট) নন, তিনি জানেন না তাঁর সাথে ও তাঁর সাহাবীদের সাথে আল্লাহ কী আচরণ করবেন।
অথচ নামাজে যে দুরুদ পড়ার প্রচলন করা হয়েছে তাতে বলা হয়, হে আল্লাহ ইবরাহীমকে যেভাবে অনুগ্রহ করেছো, মুহাম্মাদকে সেভাবে অনুগ্রহ করো। তার মানে ইবরাহীমের ব্যাপারে আর দোআর দরকার নাই, যত দোআ দরকার সব মুহাম্মাদের জন্য, প্রায় ১৫০০ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও এখনো সন্দেহ যে, আরো কতবার দোআ করলে আল্লাহ কবুল করবেন। প্রশ্ন হলো, স্বয়ং মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ কি নামাজে বলেছেন যে, হে আল্লাহ মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের প্রতি সালাত করো। তিনি কি বলেছেন যে, হে নবী সালাম তোমাকে আর সালাম আমাদেরকে আর সালাম আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে।
সারকথা হলো, দুরুদ একটি বিবেক বহির্ভুত এবং কুরআন বিরুদ্ধ অনুষ্ঠান।
মাতৃভাষায় সালাত প্রসঙ্গঃ আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন আরবী ভাষায়। এখন কেউ আরবী বা অন্য ভাষায় কুরআনের ভাব প্রকাশ করলে তা কুরআনের ভাবানুবাদ হবে তবে তা কুরআন নয়। অর্থাৎ কুরআন ও কুরআনের অনুবাদ এক কথা নয়। কুরআন পড়া ফরজ এবং কুরআন বুঝে পড়াই ফরজ। তাই যারা আরবী ভাষা পড়েই তার অর্থ বুঝতে পারে না তাদের কর্তব্য হচ্ছে কুরআন পড়ার পাশাপাশি মাতৃভাষায় তার অর্থ পড়া। এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে, সালাতেও কুরআন পড়ার পর তার অর্থ পড়ার পদ্ধতি অধিক উত্তম। বিশেষত সালাতে কী পড়া হচ্ছে তা বুঝার পূর্ব পর্যন্ত সালাতের ধারে কাছেও যেতে কুরআনে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। তাই সালাতে কী পড়া হচ্ছে তা বুঝার পূর্ব পর্যন্ত সালাত পড়া অবৈধ। এ বিষয়ে আয়াত হচ্ছে-
‘হে মু’মিনগণ, তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক তখন সালাতের ধারে কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা তোমরা বলছো’। (সূরা নিসা/০৪: ৪৩)
কেউ কেউ বলেন, এটি নেশাগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। তারা বুঝতে চায় না যে, নেশাগ্রস্তরা যদি বুঝার শর্ত থাকে তবে যারা নেশাগ্রস্ত নয় তাদের জন্য এ শর্ত আরো মজবুতভাবে আছে।
নফল সালাত প্রসঙ্গঃ কুরআনের আলোকে নফল সালাত হচ্ছে শুধুমাত্র তাহাজ্জুদ যা রাতের শেষার্ধ বা তার চেয়ে কম বা বেশি সময় ধরে পড়া যেতে পারে। এটি রসূলের জন্য একটি অতিরিক্ত ফরজ অর্থে নফল এবং আমাদের জন্য ফরজের অতিরিক্ত অর্থে নফল। দিনের বেলায় কোন নফল নামাজ না থাকার কারণ হিসাবে আল্লাহ বলেন-
‘দিনের বেলায় তো তোমার অনেক ব্যস্ততা আছে’। (সূরা মুজজামমিল/৭৩: ০৭)
তাহাজ্জুদ ব্যতীত আর কোন নফল সালাত নেই। ইশরাকের সালাত, চাসতের সালাত, আওয়াবীন সালাত, কুসুফের সালাত, খুসুফের সালাত, তারাবীর সালাত, ঈদের সালাত ইত্যাদি সবই বিদআত।
সালাত বনাম তাসবীহ এবং সালাতের প্রস্তুতিঃ কেউ কেউ সালাতের ওয়াক্ত উল্লেখ করতে গিয়ে তাসবীহ সম্পর্কিত কিছু আয়াত উল্লেখ করেন। অথচ তাসবীহ এবং সালাত অভিন্ন বিষয় নয়। সালাতের জন্য যে প্রস্তুতির শর্ত (ওজু, গোসল, তায়াম্মুম) আছে তাসবীহর জন্য তা নেই বা সালাতের জন্য যে পদ্ধতি আছে তাসবীহর জন্য তা নেই। নিচে সালাতের প্রস্তুতি সম্পর্কিত দুইটি আয়াত উল্লেখ করা হলো-
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরা যখন সালাতের দিকে দাঁড়াও (সালাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণার্থে উদ্যোগী হও) তখন তোমাদের (সমস্ত) মুখমন্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধুয়ে নাও এবং তোমাদের (সম্পূর্ণ) মাথা মাসেহ করো এবং তোমাদের টাখনু পর্যন্ত তোমাদের পা (ধুয়ে নাও)। যদি (বীর্যপাতজনিত কারণে) নাপাক অবস্থায় থাকো তাহলে গোসল করে পাক হও। যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ পেশাব পায়খানা করে আসে বা তোমরা স্ত্রীমিলন কর আর এ অবস্থায় পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো (অর্থাৎ) মাটি হাতে মেখে মুখ ও হাত মাসেহ করো। আল্লাহ তোমাদের জীবনে কঠোরতা চাপাতে চান না। তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান। আর তিনি তোমাদের উপর তাঁর নিআমাত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার’। (সূরা মায়িদা/০৫: ০৬)
‘নাপাক অবস্থায় গোসল না করে নামাজের ধারে কাছেও যেও না, তবে পথ অতিক্রমকারী হলে ভিন্ন কথা’। (সূরা নিসা/০৪: ৪৩)
আলোচনা: প্রত্যেক ওয়াক্তের সালাতের প্রস্তুতির শর্ত হিসাবে ওজু করতে হবে। কেউ ওজু করার পর সালাত পড়ার আগে পায়খানা বা পেশাব করলে তাকে আবারো ওজু করতে হবে, ওজু ছাড়া নামাজ পড়া যাবে না। কিন্তু ওজু করার পর পায়খানা বা পেশাব না করলেও একই ওজুতে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়া যাবে না।
শেষকথাঃ প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে বেশি প্রশ্ন আসে আমরা হাদীসে রসূল নামে খ্যাত বুখারী, মুসলিম ইত্যাদিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবো? এ প্রশ্ন এমন এক দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে যা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা বিষয়। তাই আমরা এ প্রবন্ধে এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম। এছাড়া আরো তিনটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়- (১) যারা বর্তমান কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেন তারা কেন তা করলেন এবং কিভাবে তা করতে পারলেন? (২) এত যুগ ধরে এত আলেম মিলে কি ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি ও পারছেন না? (৩) যারা প্রচলিত কাঠামোকে সঠিক মনে করে আমল করে ওফাত বরণ করেছেন তাদের কি হবে? আমার পাল্টা প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের করণীয় নির্ধারণে কি সত্যি এসব প্রশ্নের কোন ভূমিকা আছে? আর আমরা যদি সত্যি আল্লাহকে ন্যায়বিচারক বলে বিশ্বাস করি তাহলে এসব প্রশ্ন কি আদৌ উত্থাপিত হওয়ার যোগ্য? আমাদেরকে ভাবতে হবে যে, সত্য আসার পর টালবাহানা করা অত্যন্ত বড় অপরাধ। আমরা ভাবতে হবে, আমরা কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে পারবো? আমরা ভুল চিন্তা ও অন্ধ অনুসরণজনিত শিরক থেকে বাঁচতে চাই এবং আল্লাহর আদেশ যথাযথভাবে জেনে ও মেনে যথাযথ কল্যাণ লাভ করতে চাই।
ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ, তাওয়াক্কালতু আলাইহি ওয়া ইলাইহি উনিব’। (সূরা হূদ/১১: ৮৮)
Copy from original post...
https://sites.google.com/site/worldmuslaimummah/salat-in-3-times
##################################
২/সিজদার দোয়াঃ
1/
(2:131)
إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ ***أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ**
স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেনঃ অনুগত হও। সে বললঃ ***আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম***
**(আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন)**
2/
وَيَقُولُونَ ***سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا*** 17.108
আরবি উচ্চারণ
১৭.১০৮। অ ইয়াকুলূনা ***সুব্হা-না রব্বিনা য় ইন্ কা-না ওয়া’দু রব্বিনা-লামাফ্‘ঊলা***
বাংলা অনুবাদ
১৭.১০৮আর তারা বলে,**** ‘পবিত্র মহান আমাদের রব! আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে’***
3/
****সুবহানা রাব্বিনা'ল আলা***
(১৭ঃ১০৮, ৮৭ঃ১)
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
# রুকুতে যাওয়ার সময়ঃ
***আল্লাহু আকবার***
রুকুর দোয়াঃ
১/
قَالَ **رَبِّ إِنِّى ظَلَمۡتُ نَفۡسِى فَٱغۡفِرۡ لِى** فَغَفَرَ لَهُ ۥۤۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ١٦
আরবি উচ্চারণ
২৮.১৬। ক্ব-লা **রব্বি ইন্নী জোয়ালাম্তু নাফ্সী ফার্গ্ফিলী** ফাগফার লাহ্;ইন্নাহূ হুওয়াল্ গফূর্রু রহীম্।
২৮.১৬ ‘***হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নফ্সের প্রতি যুলম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’।***
২/
(7:143)
وَلَمَّا جَاء مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ موسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ ***سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَاْ أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ**
**সুবহানাকা তুব্তু ইলাইকা ওয়া আনা আওওয়ালুল মুমিনীন**
***হে প্রভু! তোমার সত্তা পবিত্র, তোমার দরবারে আমি তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করছি**
৩/
(7:151)
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ***وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ***
***ওয়া আংতা আর হামুর রাহিমীন***
***তুমি যে সর্বাধিক করুণাময়***
রুকু থেকে উঠেঃ
সুবহানা রাব্বিনা'ল আযিম। (১৭ঃ১০৮, ৫৬ঃ৭৪)
##################################
কোরান যথেষ্ট
সুরা আল-যুমার(৩৯) আয়াত ১৮ যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে , অতঃপর যা উত্তম , তার অনুসরন করে। তাদেরকেই আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।
কোরান থেকে নামাজ
৬:১১৪-১১৫. তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ন করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ন হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।
নামাজ ফারসি শব্দ। কোরানে বর্ণীত আকিমুস সালাতের অর্থ ব্যাপক হলেও আমরা সাধারনত সালাত বলতে নামাজ পড়াকেই বুঝে থাকি।কোরানে ৬৭ বার সালাতের উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরে ও সালাতের খুটিনাটির খোঁজে যারা কোরান ছাড়া অন্য গ্রন্থের স্মরনাপন্ন হয় , তারা কোরানে বর্নীত সেই ইহুদিদের কথাই মনে করিয়ে দেয় , যাদেরকে গরু জবাই করতে বলা হয়েছিল। যে কোন একটি গরু জবাই দিলেই যখন সহজে কাজ সমাধা হয়ে যেত , সেখানে খুটিনাটি জানতে চেয়ে তারা গরু খোঁজার কাজটি কঠিন করে তুলেছিল।
২:৬৭-৭০ যখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেনঃ আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করতে বলেছেন। তারা বলল, তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছ? মূসা (আঃ) বললেন, মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
তারা বলল, তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, যেন সেটির রূপ বিশ্লেষণ করা হয়। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলছেন, সেটা হবে একটা গাভী, যা বৃদ্ধ নয় এবং কুমারীও নয়-বার্ধক্য ও যৌবনের মাঝামাঝি বয়সের। এখন আদিষ্ট কাজ করে ফেল।
তারা বলল, তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর যে, তার রঙ কিরূপ হবে? মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেছেন যে, গাঢ় পীতবর্ণের গাভী-যা দর্শকদের চমৎকৃত করবে।
তারা বলল, আপনি প্রভুর কাছে প্রার্থনা করুন-তিনি বলে দিন যে, সেটা কিরূপ? কেননা, গরু আমাদের কাছে সাদৃশ্যশীল মনে হয়। ইনশাআল্লাহ এবার আমরা অবশ্যই পথপ্রাপ্ত হব। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেন যে, এ গাভী ভূকর্ষণ ও জল সেচনের শ্রমে অভ্যস্ত নয়-হবে নিষ্কলঙ্ক, নিখুঁত।
একে একে কোরান থেকে নিম্ন লিখিত বিষয় নিয়ে লিখব -
১) সালাতের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য
২) সালাতের ইতিহাস
৩) সালাত পূর্ব করনীয়
৪) সালাতে অঙ্গবিন্যাস
৫) সালাতে কি বলতে হবে?
৬) দৈনিক সালাতের সংখ্যা
৭) কয় রাকাত?
৮) জুমা বারের সালাত
৯) আমার সালাত
১) সালাতের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য
আল্লাহকে স্মরন করার জন্যই সালাত।
২০:১৪ আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।
সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে।
২৯:৪৫ আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।
এই আয়াত থেকে আমরা আরো জানতে পারি – আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। সালাত আল্লাহকে স্মরন করার একটা উপায় মাত্র। সালাত ছাড়াও আল্লাহকে স্মরন করা যায় এবং সকলসময় সেটাই করতে বলা হয়েছে কোরানে।
৪:১০৩ অতঃপর যখন তোমরা সালাত সম্পন্ন কর, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন সালাত ঠিক করে পড়। নিশ্চয় সালাত মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
সালাত পরকালের জন্য সর্বোত্তম বিনিয়োগ
৩৫:২৯ যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা কর, যাতে কখনও লোকসান হবে না।
সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে।
২:৪৫ ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর সালাতের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।
২:১৫৩ হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।
২) সালাতের ইতিহাস
সালাতের ইতিহাস অনেক পুরনো। কোরান থেকে যেটা জানা যায় ইব্রাহিম নবীর সময় থেকে শুরু করে পরবর্তি সকল নবী রসূলের আমলে সালাত প্রচলিত ছিল। সময়ের সাথে সাথে মানুষ সঠিক সালাত ভুলে গিয়েছিল বা বিকৃত করে ফেলেছিল।
সালাত ১৪০০ বছর আগের নুতন কোন আবিস্কার নয়। কোরান থেকেই জানতে পারি , রসূল মুহাম্মদের সমসাময়িক কাফের মুশরিকরা ও সালাত পালন করত। তবে তাদের প্রধান উপাস্য আল্লাহর সাথে সাথে অন্যান্য শরীক আলাত , মানাত ও উজ্জার উপাসনা ও করত। তাদের বিশ্বাস ছিল এই শরীকরা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তি করবে , তাদের জন্য সুপারিশ করবে। রসূলকে দিয়ে আল্লাহ সালাতকে শরীকমুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ বন্দনা ও আল্লাহর স্মরনে সঠিক সালাত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
শয়তান তো আর হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাই তো দেখতে পাই আজকের মুসলমানেরা সালাতে আল্লাহর সাথে সাথে অন্যান্য শরিকদের স্মরন করে , তাদের জন্য প্রার্থনা করে। না করলে নাকি সালাতই হবে না। এদের বিশ্বাস এই শরীকরা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তি করবে , আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। শরীকদের গ্রন্থ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব অনুসরনের কথা বল্লে , গালাগালির নহর বয়ে যায় , শারীরিক নিগ্রহের ধামকি দেয় , কন্ঠরোধের হুমকিই শুধু দেয় না বাস্তবেই কন্ঠরোধ করে।
ইব্রাহিমের সালাত।
২:১২৫ যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে সালাতের ( مُصَلًّى) জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।
মূসা ও হারুনের সালাত।
১০:৮৭ আর আমি নির্দেশ পাঠালাম মূসা এবং তার ভাইয়ের প্রতি যে, তোমরা তোমাদের জাতির জন্য মিসরের মাটিতে বাস স্থান নির্ধারণ কর। আর তোমাদের ঘরগুলো বানাবে কেবলামুখী করে এবং সালাত কায়েম কর আর যারা ঈমানদার তাদেরকে সুসংবাদ দান কর।
ঈসার সালাত।
১৯:৩১ আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে।
শুয়েবের সালাত।
১১:৮৭ তারা বলল-হে শোয়ায়েব (আঃ) আপনার সালাত কি আপনাকে ইহাই শিক্ষা দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব আমাদের বাপ-দাদারা যাদের উপাসনা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব? আপনি তো একজন খাস মহৎ ব্যক্তি ও সৎপথের পথিক।
জাকারিয়ার সালাত।
৩:৩৯ যখন তিনি কামরার ভেতরে সালাতে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বললেন যে, আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়া সম্পর্কে, যিনি সাক্ষ্য দেবেন আল্লাহর নির্দেশের সত্যতা সম্পর্কে, যিনি নেতা হবেন এবং নারীদের সংস্পর্শে যাবেন না, তিনি অত্যন্ত সৎকর্মশীল নবী হবেন।
বণী ইস্রাইলের সালাত।
২:৪৩ আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং সালাতে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়।
লুকমানের সালাত।
৩১:১৭ হে বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।
রসূলের সমসাময়িক কাফেরদের সালাত।
৮:৩৫ আর কা’বার নিকট তাদের সালাত শিস দেয়া আর তালি বাজানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই ছিল না। অতএব, এবার নিজেদের কৃত কুফরীর আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর।
আল্লাহর নিকটবর্তি হওয়ার আশায় শরীকদের জন্য উপাসনা।
৩৯:৩ জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
৩) সালাত পূর্ব করনীয়
৪:১০৩ …….. নিশ্চয় সালাত বিশ্বাসীদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
আল্লাহর স্মরন সর্বশ্রেষ্ঠ। বাস্তবে আমরা জীবণ ও জীবিকার অন্বেষনে এমনই ব্যাস্ত হয়ে পড়ি যে আল্লাহকে সকল সময় স্মরন করার কথা ভুলেই যাই। সকল কাজ কাম বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সালাত ফরজ হওয়ায় আল্লাহকে স্মরনের কাজটি বিশ্বাসীদের জন্য সহজ হয়ে গিয়েছে।
সালাত একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার। সালাতের পূর্বে ও সালাত চলাকালিন কিছু শর্ত পালন আবশ্যকীয়। এই শর্ত মানসিক ও শারিরীক উভয় প্রকারের।
সচেতন মন
যেহেতু বিশ্বাসীরা সালাতের মাধ্যমে আল্লাহকে আল্লাহকে স্মরন করে ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে , সে কারনে সালাতে কি বলছে সেটা বোঝা আবশ্যকীয় করা হয়েছে। একারনে আমরা দেখতে পাই নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তি হতে নিষেধ করা হয়েছে।
৪:৪৩ হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, ………
বিনয়ী বিনীত
২৩:১-২ মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্র।
লোক দেখানো সালাত
১০৭:৪-৬ অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর (না বুঝে পড়ে); যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে।
পরিধেয় বস্ত্র
৭:৩১ হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও,………
জুতা
২০:১২ আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় রয়েছ।
ওজু – গোসল – তায়াম্মুম
৫:৬ হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।
৪:৪৩ হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরয গোসলের আবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-তাতে মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।
কিবলা
২:১৪২ এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান।
২:১৪৪ নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।
২:১৭৭ সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্নীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।
সালাতে অঙ্গবিন্যাস
কোরানে সালাত ব্যাপক অর্থে ব্যাবহৃত হলেও এই পোস্টে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সালাত যেটাকে আমরা নামাজ বলে জানি , সেটার ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকব।
আনুষ্ঠানিক সালাতের উদাহরন আমরা দেখতে পাই ৪:১০২ আয়াতে। কোরানের আয়াতগুলো থেকে আমরা সালাতে ৩ টি পজিশান বা শারীরিক অবস্থানের কথা জানতে পারি। দাড়ানো , রুকু ও সেজদা।
৪:১০২ নং আয়াত থেকে এটা পরিস্কার , সালাত শুরু হবে দাড়ানোর মাধ্যমে এবং শেষ হবে সেজদার মধ্য দিয়ে।
দাড়ানো
২:২৩৮ সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত
আদবের সাথে দাঁড়াও।
রুকু
২:৪৩ আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং সালাতে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়। ( যেটাকে আমরা রুকু বলে জানি وَارْكَعُواْ مَعَ الرَّاكِعِينَ)
৯:১১২ তারা তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরগোযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাযতকারী। বস্তুতঃ সুসংবাদ দাও ঈমানদারদেরকে।
সেজদা
৪:১০২ যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়। কাফেররা চায় যে, তোমরা কোন রূপে অসতর্ক থাক, যাতে তারা একযোগে তোমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও তবে স্বীয় অস্ত্র পরিত্যাগ করায় তোমাদের কোন গোনাহ নেই এবং সাথে নিয়ে নাও তোমাদের আত্নরক্ষার অস্ত্র। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের জন্যে অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।
সালাতে কি বলতে হবে?
সালাতে আমরা যেটাই বলিনা কেন , সেটা বুঝে বলতে হবে এবং মধ্যম স্বরে বলতে হবে। মনে মনে ও না বা চেচিয়ে পাড়া মাথায় করাও না। এটাই কোরানিক নির্দেশ। ১৭:১১০ আয়াত যেহেতু সালাত সংক্রান্ত , সেহেতু ১৭:১১১ আয়াতেও সালাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে। সালাতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর স্মরন করি , তার সাহায্য প্রার্থনা করি , তার প্রশংসা করি সর্বপরি তার উপাসনা করি। সুরা ফাতেহার ৭ টি আয়াতের মাধ্যমে এগুলোর সবি করা সম্ভব। ধারনা করা হয় ১৫:৮৭ আয়াতে সুরা ফাতেহার কথাই বলা হয়েছে (আল্লাহই ভাল জানেন)। আল্লাহ কোরানে তার পবিত্রতা ঘোষনা করতে বলছেন , যেটা আমরা করে থাকি রুকু ও সেজদাতে।
সালাতে মধ্যম স্বর
১৭:১১০ বলুনঃ আল্লাহ বলে আহবান কর কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান কর না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই। আপনি নিজের নামায আদায়কালে স্বর উচ্চগ্রাসে নিয়ে গিয়ে পড়বেন না এবং নিঃশব্দেও পড়বেন না। এতদুভয়ের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করুন।
তাকবীর (আল্লাহু আকবর) বা আল্লাহর মহত্ব বর্ণনা করা
১৭:১১১ বলুনঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোন সাহয্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং আপনি স-সম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ন (وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا) বর্ণনা করতে থাকুন।
কোরান থেকে পাঠ করা
২৯:৪৫ আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন।
সূরা ফাতেহা
১৫:৮৭আমি আপনাকে সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কোরআন দিয়েছি।
রুকু ও সেজদাতে তাসবীহ
৫৬:৭৪
فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمِ
অতএব, আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামে পবিত্রতা ঘোষণা করুন।
৮৭:১
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى
আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন
৫০:৪০ রাত্রির কিছু অংশে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং নামাযের পশ্চাতেও (السُّجُودِ)।
শাহাদা
৩:১৮ আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।
দৈনিক সালাতের সংখ্যা
কোরানে পরিস্কারভাবে বলা নেই , দৈনিক কয়বার সালাতের জন্য দাড়ানো লাগবে। কেন কোরানে দৈনিক সালাতের সংখ্যার পরিস্কার উল্লেখ নেই , তার গূঢ় কারন আল্লাহই ভাল জানেন। যেহেতু কোরানে দৈনিক সালাতের সংখ্যার পরিস্কার উল্লেখ নেই , সেহেতু ধরে নেয়া যায় দৈনিক সালাতের সংখ্যা নির্ধারনের ভার আল্লাহ মুত্তাকিনদের বুঝের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন।
একারনে আমরা দেখতে পাই , কেউ বলছেন কোরানে দৈনিক ৫ বার , কেউ বা দৈনিক ৩ বার , আবার কেউ বা দৈনিক ২ বার সালাতের কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করছেন।
যারা দৈনিক ২বার সালাতের কথা বলেন তাদের যুক্তি হলো , কোরানে ২ টি সালাতের নাম খুজে পাওয়া যায় – ‘সালাতুল ফজর’ এবং ‘সালাতুল ঈশা’। যোহর , আছর ও মাগরিব নামে কোন সালাতের কথা কোরানে বলা নেই।
যারা দৈনিক ৩/৫ বার সালাতের কথা বলেন তাদের যুক্তি হলো , কোরানে ২:২৩৮
حَافِظُواْ عَلَى الصَّلَوَاتِ ‘সালাওয়াত’ সংরক্ষনের কথা বলা হয়েছে। ‘সালাওয়াত’ সালাতের বহুবচন অর্থাৎ তিন বা ততোধিক সালাত। এর সপক্ষে এরা আরো একটি সালাতের কথা বলেন , যার নাম ‘সালাতুল উস্তা’। ‘সালাতুল উস্তা’ অর্থ কেউ করেছেন মধ্যবর্তী সালাত , আর দৈনিক ২বার সালাতের সমর্থকরা করেছেন উত্তম সালাত , যেটা ফজর বা ঈশাকেই নির্দেশ করে।
দৈনিক ২বার সালাত
24:58 হে মুমিনগণ! তোমাদের দাসদাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখ এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্যে কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়, এমনি ভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
11:114 আর দিনের দুই প্রান্তেই নামায ঠিক রাখবে, এবং রাতের প্রান্তভাগে পূর্ণ কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক।
দৈনিক ৩ বার সালাত
2:238 সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।
দৈনিক ৫ বার সালাত
17:78 সূর্য ঢলে পড়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন এবং ফজরের কোরআন পাঠও। নিশ্চয় ফজরের কোরআন পাঠ মুখোমুখি হয়।
(1) The Dawn Prayer (Fajr in Arabic) given in 11:114, 24:58
(2) The Noon Prayer (Zuher in Arabic) , given in 17:78
(3) The Afternoon Prayer (Asr in Arabic), given in 2:238
(4) The sunset Prayer (Maghrib in Arabic), given in 11:114
(5) The Night Prayer (Isha in Arabic), given in 24:58
কয় রাকাত?
কোরানে রাকাতের কথা বলা নেই। তবে যদি আমরা ৪:১০২ নং আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করি , তাহলে সালাতে ২ টি রাকাত আছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
৪:১০২ যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়।
ভিডিও লিংকঃ
https://youtu.be/pLkozjUeis0
(Salaat)
https://youtu.be/0mYpmQQ_j4M
(Tasbih)
full salat video:
https://youtu.be/Cf5I9ZF-bW4
সূচনাঃ যারা কুরআনকে কিতাবুম মুবীন (সুস্পষ্ট কিতাব) ও ফুরকান (সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী) হিসাবে বিশ্বাস করেন, কুরআনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কথা গীতাতে থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য আর কুরআনের বিপরীত কথা সহীহ বুখারী হাদীস শরীফে থাকলেও তা মিথ্যা এ কথা যারা বিশ্বাস করেন তাঁদের জন্যই এ প্রবন্ধ। পৃথিবীর সকল মানুষও যদি আল্লাহকে সিজদা দেয় তাতেও আল্লাহর কোন লাভ নেই, আর সবাই যদি সমানে তাঁকে সিজদা দেয়া থেকে বিরত থাকে তাতেও তাঁর কোন ক্ষতি নেই। সুতরাং সালাতের বিধান হচ্ছে মানুষেরই কল্যাণের জন্য তাদেরকে আল্লাহর প্রতি অনুগত থাকার প্রশিক্ষণমূলক বিধান। খাশেয়ীনদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে কিন্তু ছাহূনদের সালাত তাদেরকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে ফেরায় না এবং তাদের সালাত সত্ত্বেও তারা জাহান্নামে যাবে (দ্র: সূরা মাউন/১০৭: ০৪-০৭)। তাই আমরা যদি খাশেয়ীন হই তথা আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখি তবে আমাদেরকে যাচাই করে দেখতে হবে ফুরকান বা সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী গ্রন্থ কুরআনের আলোকে সালাতের ওয়াক্ত ও কাঠামো কিরূপ। প্রচলিত ওয়াক্ত ও কাঠামো কুরআনসিদ্ধ না কুরআনের বিপরীত। যদি কুরআনের বিপরীত কথা মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহর নামে আমাদের কাছে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে তবু যখনি আমরা বুঝবো যে, কথাটি কুরআনবিরুদ্ধ তখনি আমরা বলে দেবো যে, কথাটি মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ বলেননি। কারণ, অবশ্যই মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ কুরআনের অনুসারী ছিলেন, তিনি কুরআনের লংঘনকারী ছিলেন না। যারা এ মানসিকতা অর্জন করতে পেরেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যেই এ প্রবন্ধ।
রাতদিনের সংজ্ঞাঃ প্রথমে রাতদিনের সংজ্ঞা বুঝে নিলে সালাতের বিষয়ে বুঝতে সুবিধা হবে। ফজর (ভোর) থেকে পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যাকালীন রক্তিমাভা বর্তমান থাকা পর্যন্ত সময় হচ্ছে দিন এবং এরপর থেকে ফজর শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময় হচ্ছে রাত। প্রমাণস্বরূপ দেখুন-
‘তা (রাত) থাকে তুলুয়ে ফজর (ভোরের উদয়) পর্যন্ত’। (সূরা কদর/৯৭: ০৫)
‘না, আমি কসম করি সাফাকের (সন্ধ্যাকালীন রক্তিমাভার) এবং লাইলের (রাতের) এবং যা রাতে সমবেত হয় তার’। (সূরা ইনশিকাক/৮৪: ১৬-১৭)
সূরা ইনশিকাকের ১৬-১৭ নং আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, সাফাক (সন্ধ্যা) দিনের অংশ এবং এরপর থেকে লাইল বা রাত শুরু হয়। আবার, সূরা কদরের ০৫ নং আয়াত থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, ফজর (ভোর) শুরু হলে লাইল বা রাত শেষ হয়ে যায় অর্থাৎ ফজর দিনের অংশ। সুতরাং সূর্যোদয়ের পূর্বেই দিন শুরু হয় এবং সূর্যাস্তের পরেও কিছুক্ষণ (সন্ধ্যা শেষ হওয়া) পর্যন্ত দিন বর্তমান থাকে।
কুরআনের আলোকে সূর্যোদয় হচ্ছে ‘তুলুয়ে সামস’, সূর্য ঢলে পড়া হচ্ছে ‘দুলুকে সামস’ এবং সূর্যাস্ত হচ্ছে ‘গুরুবে সামস’। সুতরাং কুরআনের আলোকে দিনকে চারভাগে ভাগ করা যায়, (১) ফজর বা প্রভাত (২) তুলুয়ে সামস থেকে দুলুকে সামস (৩) দুলুকে সামস থেকে গুরুবে সামস (৪) সাফাক বা সন্ধ্যা। আবার তুলুয়ে সামস থেকে গুরুবে সামস পর্যন্ত সময়কে ‘দুহা’ তথা ‘সূর্যের দীপ্তিকাল’ বলা হয়েছে। দিনকে বৃহত্তর দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- (১) ফজর থেকে দুলুকে সামস পর্যন্ত (২) দুলুকে সামস থেকে সাফাকের শেষ পর্যন্ত বা গাছাকিল লাইল (রাতের প্রাথমিক অন্ধকারের সমাচ্ছন্নতা) এর পূর্ব পর্যন্ত।
কুরআনের আলোকে সালাতের ওয়াক্তঃ
কুরআনে বলা হয়েছে ‘নিশ্চয় সালাত মু’মিনদের উপর ওয়াক্ত ঠিক করা কিতাব বা বিধান হিসাবে বর্তমান বা বিধিবদ্ধ’। (সূরা নিসা/০৪: ১০৩)
(4:103)অতঃপর যখন তোমরা নামায সম্পন্ন কর, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন নামায ঠিক করে পড়। নিশ্চয় নামায মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
সুতরাং কেউ যদি বলে যে, কুরআনে সালাতের ওয়াক্ত ঠিক করে দেয়া হয়নি বা কুরআনে সালাতের সব ওয়াক্ত উল্লেখ করা হয়নি বা কুরআনে উল্লেখকৃত ওয়াক্তের চেয়ে কম বা বেশি ওয়াক্তে সালাত সম্পন্ন করা ফরজ তবে অবশ্যই সে মিথ্যা বলে এবং কুরআনবিরোধী বা আল্লাহদ্রোহী কথা বলে এবং এমনকি যদি সে তা রসূলের নামে বলে তবে সে রসূলের ব্যাপারেও একটি মিথ্যাকে আরোপ করে মাত্র, অর্থাৎ সে এমন একটি বিষয়কে রসূলের নামে বলে যার সাথে রসূলের সম্পর্ক নাই।
এবার আমরা দেখবো, কুরআনে নামাজের যেসব ওয়াক্ত ঠিক করে দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ও পরিসীমা কী। এ বিষয়ে নিম্নের চারটি আয়াতে বিধান রয়েছে-
‘হিফাজাতকারী হও সালাতসমূহের উপর এবং সালাতিল উসতা (এর উপর হিফাযাতকারী হওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে)’। (সূরা বাকারা/০২: ২৩৮)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছ, যেন তোমাদের অনুমতি নেয় যারা তোমাদের ডান হাতের অধীনস্থ এবং তোমাদের মধ্য থেকে যারা এখনো বুদ্ধির পরিপক্কতার বয়সে পৌঁছেনি, তিনটি সময়। সালাতিল ফজরের আগে এবং যুহরে যখন তোমরা (বিশ্রামের জন্য) নিজেদের পরিধেয় বস্ত্র শিথিল করে রাখো এবং সালাতিল ইশার পর’। (সূরা নূর/২৪: ৫৮)
‘একটি সালাত কায়িম কর ‘দুলুকিস সামসি ইলা গাছাকিল লাইল’ এর সময়কালে (অর্থাৎ সূর্য ঢলে পড়া থেকে রাতের প্রাথমিক অন্ধকার বা রাতের সূচনা পর্যন্ত সময়কালে)। আর ফজরে কুরআন পাঠ কর’। (সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ৭৮)
‘একটি করে সালাত কায়িম কর দিনের দুই তরফে (ভাগে) এবং (দিন শেষে) রাত থেকে (রাতের অন্তর্ভুক্ত) নিকটবর্তী সময়ে (তথা রাতের প্রথমাংশে/প্রথমার্ধে)’। (সূরা হূদ/১১: ১১৪)
আলোচনাঃ উপর্যুক্ত আয়াতসমূহ থেকে সালাতের ওয়াক্তসমূহ সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্টভাবে জানা যায়। সূরা বাকারার ২৩৮ নং আয়াতে ‘আস সালাওয়াত’ হিফাজাত করতে বলা হয়েছে, তারপর বিশেষভাবে ‘আস সালাতিল উসতা’ হিফাজাত করতে বলা হয়েছে। আরবীতে বচন তিনভাগে বিভক্ত- একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন। একবচনে ‘সালাত’, বহুবচনে ‘সালাওয়াত’। এখানে প্রথমে ‘সালাওয়াত’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। আরবীতে বহুবচন বলতে বুঝায় দুইয়ের বেশি তথা অন্তত তিন। তাহলে এখান থেকে আমরা প্রাথমিকভাবে বলতে পারি সালাতের ওয়াক্ত অন্তত তিনটি, এর চেয়ে কম নয়, বেশি হতে পারে কিনা তাও আমরা এ আয়াত থেকেও বুঝতে পারবো। এখানে দ্বিতীয় লক্ষ্য করার বিষয় হলো, দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘সালাতিল উসতা’ হিফাজাতের কথা বলা হয়েছে। ‘উসতা’ একটি আপেক্ষিক শব্দ, এর অর্থ ‘মধ্যবর্তী’। সুতরাং ‘সালাতিল উসতা’ মানে ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’। অর্থাৎ এর দুপাশে আরো অন্তত একটি করে সালাত আছে। বরং প্রকৃত কথা হচ্ছে এর দুপাশে আরো কেবলমাত্র একটি করে সালাত আছে। কারণ, সত্যিকারার্থে আরবীতে ‘উসতা’ শব্দটি দ্বারা তিনের মধ্যবর্তী বিষয়কে বুঝায়। কিন্তু যেহেতু হাদীস অনুযায়ী নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত তাই বর্তমানে ‘উসতা’ শব্দের ব্যাখ্যা কেউ কেউ এভাবে দেন যে, হাতের পাঁচ আঙ্গুলের মধ্যবর্তী আঙ্গুলটি উসতা আঙ্গুল। অর্থাৎ তাঁরা বলতে চান, উসতা বলতে পাঁচের মধ্যবর্তী বিষয়কে বুঝায়। আবার কেউ কেউ বলতে চান তিন থেকে শুরু করে যে কোন বেজোড় সংখ্যক বিষয়ের মধ্যবর্তী স্তরে অবস্থিত বিষয়ই উসতা। যেমন পাঁচটি বিষয়ের ক্ষেত্রে তিন নং ক্রমিকের বিষয়টি উসতা, সাতটি বিষয়ের মধ্যে চার নং ক্রমিকের বিষয়টি উসতা ইত্যাদি। যেহেতু সালাতের ওয়াক্ত হবে পূর্ণসংখ্যা তাই উসতা শব্দটির কারণে একথা প্রমাণিত যে, সালাতের ওয়াক্তসংখ্যা দুইয়ের বেশি এবং অবশ্যই তা বেজোড় সংখ্যা। এখন সালাত যদি তিন ওয়াক্ত হয় তবে অন্য দুই ওয়াক্তের নাম অথবা যদি পাঁচ ওয়াক্ত হয় তবে অন্য চার ওয়াক্তের নাম আমরা কুরআনে পাবো। সুতরাং আমাদেরকে দেখতে হবে কুরআনে আর কোন কোন ওয়াক্তের বা কয় ওয়াক্তের নাম পাওয়া যায়। এছাড়া ‘সালাতিল উসতা’ বা ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’ এর সময়ও কখন শুরু হয় এবং কখন শেষ হয় তাও কুরআন থেকে জানতে হবে।
এ আয়াতে আমরা আরো দুটি বিষয় লক্ষ্য করি, যা আমাদেরকে কুরআন থেকে সালাতের ওয়াক্ত জানার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। (১) ‘আস সালাত’ শব্দটি একবচন হলেও এ শব্দটি দ্বারা কুরআনে অনেক স্থানে সাধারনভাবে সালাতকে বুঝানো হয়েছে, কিন্তু এখানে বহুবচনে ‘আস সালাওয়াত’ শব্দটি উল্লেখ করায় এটি স্পষ্ট যে, সুনির্দিষ্ট পদাশ্রিত নির্দেশক (Definite Article) ‘আল’ ব্যবহার করে তারপর একবচনে ‘সালাত’ শব্দ ব্যবহার করলে সবসময় সাধারনভাবে সালাতকে বুঝানো হয় না, বরং ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে ‘আস সালাত’ দ্বারা একটিমাত্র (ওয়াক্তের) সালাতকে বুঝায়। কারণ, এখানে ‘আস সালাতিল উসতা’ তথা ‘মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত’ এর সাথে একই আয়াতে সালাতসমূহকে বুঝাতে গিয়ে ‘আস সালাত’ শব্দ ব্যবহার না করে বরং ‘আস সালাওয়াত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (২) আর এ থেকে এ কথাও জানা যায় যে, একবচনের শব্দ ‘আস সালাতিল উসতা’ দ্বারা একটিমাত্র ওয়াক্তকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মধ্যবর্তী ওয়াক্তে তিনটি সালাত নয় বরং একটি সালাতই ফরজ।
সূরা নূরের ৫৮ নং আয়াতে আমরা সালাতের দুটি ওয়াক্ত সম্পর্কে জানতে পারি (১) সালাতিল ফজর (২) সালাতিল ইশা। সমগ্র কুরআনে সালাতের দৈনন্দিন ওয়াক্ত সম্পর্কে আমরা আর কোন ওয়াক্তের নাম পাই না। সুতরাং সমগ্র কুরআনে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে যার কুরআনিক নাম (১) সালাতিল ফজর (২) সালাতিল উসতা (৩) সালাতিল ইশা।
সালাতিল উসতা হচ্ছে ফজর ও ইশার মধ্যবর্তী ওয়াক্তের সালাত, এর সময়সীমা বলা হয়েছে সূরা বনী ইসরাইলের ৭৮ নং আয়াতে। তা থেকে আমরা জানি, সালাতিল উসতার সময় শুরু হয় দুলুকে সামস বা সূর্য হেলে পড়ার মাধ্যমে আর শেষ হয় গাছাকিল লাইল বা রাতের প্রাথমিক অন্ধকারের আগমন তথা সাফাকের (সন্ধ্যার) সমাপ্তির দ্বারা। বর্তমানে যে সময় লোকেরা যুহর, আসর ও মাগরিব সালাত সম্পন্ন করে এ পুরো সময়টা হচ্ছে কুরআনের আলোকে একটিমাত্র সালাতের সময়, সালাতিল উসতার সময়। কারণ, আয়াতে একবচনে আস সালাত কায়িম করতে তথা এ পুরো সময়টাতে একটিমাত্র সালাত কায়িম করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা সামান্য আগে জেনেছি ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে একবচনে ‘আস সালাত’ ব্যবহার করলে তা দ্বারা একটিমাত্র সালাত বুঝায়, সাধারনভাবে সালাত বুঝায় না। কারণ, যদি এক্ষেত্রে ‘আস সালাত’ দ্বারা সাধারনভাবে সালাত বুঝাতো তবে সূরা বাকারায় সালাতসমূহের কথা উল্লেখ করার জন্য ‘আস সালাওয়াত’ শব্দ ব্যবহার করা হতো না। তাই, ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে ‘আস সালাত’ বললে একটিমাত্র সালাতকে বুঝতে হবে, একাধিক সালাত নয়।
সূরা হূদের ১১৪ নং আয়াতে তিন ওয়াক্ত সালাতের নির্দেশ একই আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে। এখানেও ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত করে ‘আস সালাত’ কায়িম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে ‘দিনের দুইভাগে এবং রাতের প্রথমভাগে’। যেহেতু এখানে তিনটি সময় সালাত কায়িম করার নির্দেশ তাই ‘আস সালাত কায়িম’ বলতে একটি করে সালাত কায়িম করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বক্তব্যের ভাব অনুযায়ী এখানে ‘একটি সালাত’ এর স্থলে অর্থ হবে ‘একটি করে সালাত’। এখন তিনটি সময়ে একটি করে সালাত কায়িম করার অর্থই হচ্ছে মোট তিন ওয়াক্ত সালাত কায়িম করা। দিনের প্রথম ভাগের সালাত হচ্ছে সালাতিল ফজর, দ্বিতীয় ভাগের সালাত হচ্ছে সালাতিল উসতা এবং রাতের প্রথমভাগের সালাত (রাতের ফরজ সালাত) হচ্ছে সালাতিল ইশা। কেউ কেউ আয়াতে ব্যবহৃত ‘তরফ’ শব্দের অর্থ করেন ‘প্রান্ত’ কিন্তু তা ‘তরফ’ শব্দের সঠিক অর্থ নয়। কারণ, কোন জিনিসের প্রান্ত কখনো দুইয়ের বেশি হয় না, এটি একটি চিরন্তন সত্য। আর কুরআনে ‘তরফ’ শব্দের দ্বিবচন ‘তরাফায়ি’ এবং বহুবচন ‘আতরফ’ ব্যবহৃত হয়েছে, তাই তরফ দুইয়ের বেশি হতে পারে, এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, তরফ অর্থ প্রান্ত নয় বরং তরফ অর্থ ভাগ। সুতরাং কুরআনে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের আলোকে তিন ওয়াক্ত সালাত ফরজ, এর চেয়ে কমও নয়, বেশিও নয়। সালাতুল যুহর, সালাতুল আসর ও সালাতুল মাগরিবের নাম বা প্রসঙ্গ বা বিধান কুরআনে নেই। বিশেষত: সালাতুল আসর ও সালাতুল মাগরিব তো শব্দ হিসাবেই অগ্রহণযোগ্য। কারণ, সালাতুল আসর অর্থ মহাকালের সালাত, আর সালাতুল মাগরিব অর্থ সূর্যাস্তের দিকের (পশ্চিম দিকের) সালাত।
সালাতে স্বরের মাত্রাঃ সালাতে স্বরের মাত্রার বিষয়ে কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে, সালাত সম্পন্ন করতে হবে মধ্যম স্বরে। এ বিষয়ে কুরআনের নির্দেশটি নিম্নরূপ-
‘তোমার সালাতে স্বর বেশি উঁচুও করো না আবার বেশি নিচুও করো না, বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী মাত্রা অবলম্বন করো (তথা মধ্যম স্বরে সালাত সম্পন্ন কর)’। (সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ১১০)
অথচ আমরা যদি কোন ওয়াক্তে সালাত জোরে আওয়াজ করে পড়ি, কোন ওয়াক্তে নিচু আওয়াজে পড়ি, অথবা কোন রাকায়াত জোরে আওয়াজ করে পড়ি আর কোন রাকায়াত নিচু আওয়াজে পড়ি তাহলে তা কি কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ লংঘন নয় তথা কুফরি নয়? প্রকৃত পক্ষে সালাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মধ্যম মাত্রার স্বরে পড়তে হবে।
সালাতে মুক্তাদীর স্বরের মাত্রাঃ সালাতে মুক্তাদী আস্তে বা জোরে সূরা ফাতিহা পড়বে কিনা এও এক বহুল বিতর্কিত বিষয় হিসাবে সমাজে বর্তমান। এ বিষয়ে কুরআনের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হচ্ছে যখন কারো সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তার কর্তব্য হচ্ছে মনোযোগ সহকারে শুনা ও চুপ থাকা। কি নামাজের ভিতরে কি নামাজের বাহিরে সবসময় আল্লাহর এ নির্দেশ পালন করতে হবে। সুতরাং ইমাম যখন কুরআন তিলাওয়াত করেন তখন মুক্তাদীর কর্তব্য তা মনোযোগ দিয়ে শুনা ও চুপ থাকা, সরবে বা নীরবে নিজেও তিলাওয়াত করা নয়। সুতরাং কেউ এর ব্যতিক্রম করলে সে কুরআনের পরিপন্থী কাজই করলো। আর কুরআনের এ নির্দেশের কারণে যারা একসাথে বসে প্রত্যেকে উচ্চ আওয়াজে কুরআন খতম বা কুরআন খানি করছে, তারা স্পষ্টত কুরআনের বিধানকে লংঘন করছে তথা কুফরি করছে। এ বিষয়ে কুরআনের আয়াতটি হচ্ছে-
‘যখন (তোমাদের সামনে) কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুন এবং চুপ থাক যাতে তোমাদেরকে রহম (অনুগ্রহদান) করা হয়’। (সূরা আ’রাফ/০৭: ২০৪)
সালাতের কসর কখনঃ সাধারনভাবে ধারনা করা হয় সফরে কসর করা বাধ্যতামূলক কোন ওজর থাকুক বা না থাকুক। আবার কতটুকু পথের সফরে কসর করতে হবে, কতদিনের সফরে কসর করতে হবে ইত্যাদি নানান কথা প্রচলিত আছে অথচ এর সবই কুরআনবিরোধী ধারনা। কারণ, কুরআনে কসরের জন্য সফরের পথের দৈর্ঘ্য বা সময়সীমার কোন শর্ত আরোপ করা হয়নি। অন্যদিকে, শুধুমাত্র কোনরূপ ক্ষতির আশংকাগ্রস্ত অবস্থায় সফরে কসর করার অনুমতি দেয়া হয়েছে, আদেশ নয়। অর্থাৎ যে সফরে কোনরূপ আশংকা নেই তাতে কসরের অনুমতি নেই। আর যে সফরে ক্ষতির আশংকা আছে তাতে কসরের অনুমতি আছে, আদেশ নয়। এরূপ সফরে কসর করলে গুনাহ হবে না, তা জানানো হয়েছে, কসরকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কসর সম্পর্কে কুরআনে যে আয়াতে অনুমতি দেয়া হয়েছে তা নিম্নরূপ-
‘যখন তোমরা পৃথিবীতে সফর করো তখন তোমাদের জুনাহ (গুনাহ) নেই, যদি তোমরা সালাতে কসর কর, যদি তোমরা ভয় কর যে, তোমাদেরকে ফিতনায় ফেলবে যারা কুফরি করেছে তারা, নিশ্চয় কাফিরগণ তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু’। (সূরা নিসা/০৪: ১০১)
আস সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআ এবং সালাত কাযা করাঃ আস সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআ বলতে বুঝায় জুমআর দিনের অন্তর্ভুক্ত একটি সালাত। অর্থাৎ জুমআর দিনের সব ওয়াক্ত সালাতই জুমআর সালাত নয়, বরং একটি ওয়াক্তের সালাত জুমআর সালাত। জুমআ থেকেই জামায়াত। সুতরাং সপ্তাহে একদিন এক ওয়াক্ত সালাত জামায়াতে কায়িম করা ফরজ। এছাড়া কুরআন থেকে বুঝা যায়, যে কোন সালাতই জামায়াতের সাথে পড়া উত্তম। আর জুমআর সালাতের জন্য নিদা (আহবান) করা প্রয়োজন, প্রতিদিনের সব ওয়াক্তের জন্য নিদা (আযান নয়) করার প্রয়োজন নেই। (কুরআন অনুযায়ী, নবীউল্লাহ ইবরাহীমকে হজ্জের জন্য আযান বা ঘোষনা দেয়ার আদেশ দেয়া হয়েছিল, সুতরাং তিনি তা করেছেন আর আল্লাহ সে ঘোষনার বিষয়টি আমাদেরকে কুরআনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং এখন আর আযানের প্রয়োজন নেই)। কুরআনে জুমআর সালাতের জন্য নিদা করার পর বিক্রয় তথা অন্য ব্যস্ততা বন্ধ করে আল্লাহর যিকরের দিকে দ্রুত চলে আসতে এবং সালাত কাযা করার পর আবার কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে আদেশ দেয়া হয়েছে। সুতরাং (১) জুমআর সালাত হচ্ছে এমন সময় যার আগে পরে মানুষ ব্যবসায় ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকে তথা জুমআর দিনের সালাতিল উসতাই জুমআর সালাত। (২) জুমআর সালাতের পর তথা জুমআর ফরজ সালাতের পর সুন্নাত সালাত নামে আলাদা সালাত পড়া কুরআনসিদ্ধ নয়, বরং জুমআর সালাতের পর কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে হবে। (৩) সালাত কাযা করার অর্থ যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করা এবং সালাত কাযা করার অর্থ কোনক্রমেই নির্দিষ্ট সময়ে সালাত না পড়ে অন্য সময়ে পড়া নয়। কুরআনে বকেয়া সালাত আদায়ের কোন বিধান নেই। সুতরাং কাযা নামাজ নামে বকেয়া সালাত আদায় একটি বিদআত। কুরআন অনুযায়ী যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করা ফরজ। যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করতে না পারলে তাওবা করতে হবে তথা অনুশোচনাবোধ থাকতে হবে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, সামনে আর এরূপ না করার সংকল্প করতে হবে এবং যথাসময়ে সালাত সম্পন্ন করার দিকে ফিরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, সালাত সম্পন্ন করার দ্বারা আল্লাহর কোন লাভ হয় না, বরং এটি আমাদেরকে ‘আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা ও অন্যায় ও অশ্লীল কাজের প্রতিরোধক প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম’ হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। জুমআর সালাত ও সালাত কাযা করার বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য নিম্নরূপ-
‘হে ঐসব লোক, যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, যখন সালাতি মিন ইয়াওমিল জুমআর জন্য নিদা (আহবান) করা হয়, তখন দ্রুত চলে আসো আল্লাহর যিকরের দিকে এবং ত্যাগ করো বিক্রয়, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা জ্ঞানলাভ করো। আর যখন সালাত কাযা (যথাসময়ে সম্পন্ন) করো তখন কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর ফযল (অনুগ্রহ) সন্ধান কর এবং বেশি করে আল্লাহর যিকর (স্মরণ) কর যাতে তোমরা সফল হও’। (সূরা জুমআ/৬২: ০৯-১০)
সালাতের রাকায়াতঃ প্রথম কথা হলো রাকায়াত শব্দটি কুরআনিক পরিভাষা নয়। রাকায়াত শব্দটি এসেছে রুকু শব্দ থেকে। বুঝানো হয়, এক রুকুতে এক রাকায়াত। সাধারন ধারনা হচ্ছে প্রতি রাকায়াতে একটি রুকু ও দুইটি সিজদা করতে হয়। রুকু বলতে বুঝানো হয় দুই হাত হাঁটুতে রেখে অবনত হওয়া আর সিজদা বলতে বুঝানো হয় কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে অবনত হওয়া। রাকায়াত শব্দটি দ্বারা নামাজের ইউনিটকে বুঝানো হয়। এজন্য কুরআনের আলোকে আমরা সিজদা শব্দ ব্যবহার করতে পারি এবং প্রশ্নটা এভাবে সাজাতে পারি যে, সালাতে কয়টি সিজদা। আর বিষয়টি এরূপ যে, এক সিজদা বলতে এক ইউনিট বুঝবো। কুরআন থেকে জানা যায়, সালাতে দুইটি সিজদা অর্থাৎ দুইটি ইউনিট। প্রচলিত কথার সাথে মিল করে বললে বলতে হয় প্রত্যেক ওয়াক্তে দুই রাকায়াত সালাত আদায় করা ফরজ। অর্থাৎ দুইয়ের চেয়ে কম হবে না এবং দুইয়ের চেয়ে বেশিও হবে না। আর কসর সালাত হবে এক রাকায়াত তথা এক সিজদা বা এক ইউনিট। এ বিষয়ে কুরআনের বক্তব্য নিম্নরূপ-
‘(কাফিরদের কর্তৃক ফিতনায় পড়ার আশংকাগ্রস্ত অবস্থায়) যখন তুমি (রসূল) তাদের মধ্যে থাক এবং তাদের জন্য সালাত কায়িম করো তখন তাদের মধ্য থেকে একদল যেন তোমার সাথে দাঁড়ায় এবং তারা যেন তাদের অস্ত্র সাথে নিয়ে সতর্ক থাকে। তারপর যখন তারা সিজদা করে নেবে (একটি সিজদা দেবে) তখন তারা যেন তোমাদের পেছনে সরে যায়। আর আসবে অন্যদল যারা সালাত করেনি তখন তারা যেন তোমার সাথে সালাত করে। তারা যেন সতর্কতা অবলম্বন করে এবং সশস্ত্র থাকে, কাফিররা তো এ সুযোগই চায় যে, যদি তোমরা তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও মালসামানা থেকে অসাবধান হয়ে যাও তবে যেন তারা একসাথে তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। অবশ্য বৃষ্টির কারণে যদি তোমরা কষ্টকর মনে করো বা যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে পড় তাহলে অস্ত্র সরিয়ে রাখায় তোমাদের জুনাহ (গুনাহ) হবে না। তবে খুব সতর্ক হয়ে থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের জন্য অপমানজনক শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন’। (সূরা নিসা/০৪: ১০২)
আলোচনাঃ এ আয়াতের পূর্বের আয়াতে সফরে কাফিরদের ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার আশংকাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কসর করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ আয়াতে তারই ধারাবাহিকতায় সালাতে কসর করার পদ্ধতি এবং পূর্ণ সালাতের কাঠামো বলে দেয়া হয়েছে। এ আয়াতে একসাথে থাকা অবস্থায় জামায়াতে সালাতের নির্দেশ রয়েছে। তারপর যারা আশংকাগ্রস্ত তাদের সালাতে কসর করার পদ্ধতি বলা হয়েছে। এ আয়াত থেকে জানা যায়, সালাতের কাঠামো হচ্ছে কিয়াম (দাঁড়ানো) ও সিজদা (প্রণত হওয়া)। কিয়াম দ্বারা সালাত শুরু এবং সিজদা দ্বারা সালাত শেষ। তবে আয়াতটি থেকে জানা যায়, একদল এক সিজদা করছে এবং তারপর অন্যদল আসছে (এবং স্বাভাবিকভাবে তারাও প্রথম দলের মত এক সিজদাই করবে কারণ, তা না হলে দুই দলের এক দলের সালাত কসর হবে না বা স্বয়ং ইমাম যেহেতু উভয় দলের সাথে থাকছেন তাই তাঁর সালাত পূর্ণাঙ্গ হলে দুই দলের এক দলেরও সালাত পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না যেহেতু তারা কেউ পূর্ণ সময় ইমামের সাথে সালাত সম্পন্ন করছে না বরং অবশ্যই ইমামের সালাত তাদের উভয় দলের যৌথ সময়ের সমান কিন্তু একটি দলেরও হুবহু অনুরূপ নয়। তাই উভয় দলের সালাত কসর হওয়ার কারণে উভয় দলের সিজদার পরিমাণ পরস্পর সমান এবং ইমামের সিজদা হচ্ছে উভয় দলের যৌথ পরিমাণের সমসংখ্যক)।
যেহেতু ইমামের ওজর নেই, তাই ইমাম কসর না করে পূর্ণ সালাত সম্পন্ন করলেন আর দুই দল কসরের অনুমতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক সিজদা করে দেয়ার মাধ্যমে সালাত কসর করলেন। সুতরাং এ কথা সুস্পষ্ট যে, সালাতের কসর হলো এক সিজদা এবং সালাতের পূর্ণরূপ হলো দুই সিজদা। এ আয়াতে সালাত কসর করার পদ্ধতি এবং পূর্ণ সালাতের কাঠামো একসাথে বলে দেয়া হয়েছে, যেহেতু কুরআনে সালাতের পূর্ণ কাঠামো প্রদান করা প্রয়োজন ছিল তাই প্রসঙ্গক্রমে এখানে তা উপস্থাপিত হয়েছে।
এখানে ইমামের সালাত কসর হলে মুক্তাদীর সালাত অতিমাত্রার কসর হয় আর মুক্তাদীর সালাত কসরের যথাযথ রূপ হলে ইমামের সালাত কসর নয়। যেহেতু এ আয়াত ব্যতীত আর কোথাও কসরের ও পূর্ণ সালাতের রূপ উপস্থাপিত হয়নি, তাই অবশ্যই এ আয়াতে মুক্তাদীর সালাতই কসরের একমাত্র রূপ এবং ইমামের সালাতই পূর্ণ সালাতের একমাত্র রূপ।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে, এ আয়াতে সালাত কসর করার জন্য এক সিজদার কথা কিভাবে জানা গেল? এর জবাব হচ্ছে, যেহেতু আয়াতটিতে বলা হয়েছে ‘যখন তারা সিজদা করে নেবে তখন তারা যেন তোমাদের পিছনে সরে যায়’। আর ‘সিজদা করে নেবে’ দ্বারা একটি সিজদা দেয়াকেই বুঝায়, কারণ, একাধিক সিজদার বিষয় হলে তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকতো, এটাই আরবী ভাষার বাকরীতি, তাই এখানে আলাদাভাবে সিজদার দ্বিবচন বা বহুবচন ব্যবহৃত না হওয়ায় এখানে একটি সিজদার আদেশ রয়েছে বলে প্রমাণিত। সুতরাং কসর সালাতে একাধিক সিজদা দেয়া যাবে না এবং পূর্ণ সালাতে দুইয়ের চেয়ে কম বা বেশি সিজদা দেয়া যাবে না।
রুকুঃ রুকু সম্পর্কে বুঝার জন্য প্রথমে অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হচ্ছে। কুরআনে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয় মু’মিনরা সফলতা লাভ করেছে যারা তাদের সালাতে খাশিয়ূন বা খুশুকারী’ (সূরা মু’মিনূন/২৩: ০১-০২)। যারা খুশু করে তাদেরকে বলে খাশিয়ূন, তদ্রুপ যারা রুকু করে তাদেরকে বলে রাকিয়ূন। এখন সালাতে খুশু করার কথা কুরআনে থাকা সত্ত্বেও খুশু করার জন্য কি কোন কাঠামো অবলম্বন করা হয়? হয় না। কেন? কারণ, সবাই জানে, খুশু হচ্ছে মনের ব্যাপার বা একটি মনোভাব। আসলেও তাই। কুরআনে খাশিয়ূনের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে- যারা আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি রাখে। অর্থাৎ আখিরাতে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিই খুশু। আয়াতটি হচ্ছে- ‘সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাও, নিশ্চয় উহা বড় ধরনের (কষ্টকর) বিষয়, কিন্তু তাদের জন্য নয় যারা খাশিয়ীন। যারা ধারণা রাখে যে, তাদেরকে সাক্ষাৎ করতে হবে তাদের রবের সাথে এবং তারা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’ (সূরা বাকারা/০২: ৪৫-৪৬)। রুকুও খুশুর মত একটি মনোভাব। রুকু শব্দের অর্থ মানসিকভাবে ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা। এই ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা যে মানসিক বিষয় বা একটি মনোভাবকে প্রকাশ করে তার প্রমাণ হচ্ছে নিম্নের আয়াতসমূহ-
‘নিশ্চয় মু’মিনদের ওলী হচ্ছেন আল্লাহ এবং তাঁর রসূল এবং যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছে, যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত নিশ্চিত করে এ অবস্থায় যে তারা রাকিয়ূন/রুকুকারী’। (সূরা মায়িদা/০৫: ৫৫)।
আলোচনা: এ আয়াত থেকে জানা যায়, রুকু এমন একটি বিষয় যা শুধু সালাতে নয়, যাকাতেও থাকতে হয়। বক্তব্যের ধরন থেকেই বুঝা যায় রুকু বলতে একটি মানসিক অবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যে মনোভাব না থাকলে সালাত এবং যাকাত গ্রহণযোগ্য হবে না। অর্থাৎ রুকু হচ্ছে সালাত ও যাকাতের প্রাণসত্তা যা ব্যতীত সালাত ও যাকাত নিছক বাহ্যকাঠামো মাত্র, প্রকৃত কোন ইবাদাতে পরিণত হয় না। রুকু শব্দের অর্থ ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা, আর এখানে এ কথা স্পষ্ট যে, এ ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা বলতে মানসিকভাবে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত থাকাকে বুঝানো হয়েছে।
‘(বিবাদের বিবরন শুনে) সে (দাউদ) বললো, এ ব্যক্তি তোমার দুম্বাটি তার দুম্বাগুলোর সাথে দাবি করে তোমার উপর জুলুম করেছে। নিশ্চয় যারা একসাথে বাস করে তারা অনেক সময় একে অপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করে। তবে শুধু তারাই এ থেকে বেঁচে থাকে যারা ঈমান (বিশ্বাস) করে ও আমলে সালিহাত করে। আর এমন লোক কমই হয়। (এ কথা বলতে বলতেই) দাউদ ধারনা করলো যে, আমি আসলে তাকে এক পরীক্ষায় ফেলেছি। তখন তিনি তাঁর রবের কাছে মাফ চাইলেন এবং রুকুতে (আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঝুঁকে যাওয়ার মনোভাবে) নিবিষ্ট হলেন এবং তাঁর দিকে এসে গেলেন’। (সূরা সোয়াদ/৩৮: ২৪)
আলোচনা: এ আয়াত থেকে জানা যায়, নবীউল্লাহ দাউদ যখন বুঝতে পারলেন তিনি একটি পরীক্ষায় পড়ে গেছেন তখন তিনি আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেন এবং রুকুতে নিবিষ্ট হলেন। প্রচলিত অনেক অনুবাদে এখানে লেখা হয়েছে তিনি সিজদায় ঝুঁকে পড়লেন। অথচ আয়াতে আছে রুকু, অনুবাদে রুকুর বদলে সিজদা শব্দের প্রয়োগ একটি অনধিকার চর্চা। যদি সিজদা-ই হতো তবে আল্লাহ কি সিজদা শব্দ প্রয়োগ করতে পারতেন না? তাহলে এটা নিশ্চিত যে, রুকু অর্থ রুকু, সিজদা নয়। এখন, প্রশ্ন হলো, রুকু বলতে যদি তা-ই বুঝায় যা বর্তমানে প্রচলিত ধারনা যে, দুই পায়ের হাঁটুতে দুই হাতের কবজি রেখে সামনে ঝুঁকে যাওয়া বা ঝুঁকে থাকা তাহলে, প্রশ্ন হলো, কেন দাউদ সিজদা না করে রুকু করলেন? তিনি যদি সিজদা করতেন তবে তাতেই কি অধিকতর বিনয় প্রকাশ করা হতো না? আসলে দাউদ মানসিকভাবে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে গেলেন এটাই এ আয়াত থেকে বেশি স্পষ্ট হয়।
‘সালাত কায়িম করো, যাকাত নিশ্চিত করো এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু করো’। (সূরা বাকারা/০২: ৪৩)
আলোচনা: এ আয়াতকে অনেকে জামায়াতে নামাজ পড়ার দলীল হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। অথচ আমরা আগেই দেখেছি রুকু শুধু নামাজের অংশ নয়, বরং রুকু এমন একটি বিষয় যা সালাত ও যাকাত উভয়টির মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকতে হয়। রুকুকারীদের সাথে রুকু কর কথাটি এভাবে বলা হয়েছে ‘ওয়ারকাউ মায়ার রাকিয়ীন’। ‘মায়া’ অর্থ ‘সাথে’। এই সাথে বলতে সত্তাগতভাবে সবাই পাশাপশি দাঁড়িয়ে সাথে হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা বুঝায় না। যেমন, বলা হয়েছে, ‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরা সবর ও সালাতের দ্বারা (আমার কাছে) সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন’ (সূরা বাকারা/০২: ১৫৩)। এখানে আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন কথাটি এভাবে বলা হয়েছে ‘ইন্নাল্লাহা মায়াস সাবিরীন’। এখানে আল্লাহ সত্তাগতভাবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলা হয়নি, বরং তিনি সবরকারীদেরকে সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। তদ্রুপ, রুকুকারীদের সাথে রুকু করার জন্য কোন আনুষ্ঠানিকতা অপরিহার্য নয়। বরং যারা রুকু করে তাদের সহযোগী হয়ে রুকু করা অর্থাৎ যারা রুকু করে তাদের সহযোগীও হওয়া আবার নিজেরাও রুকু করার কথা বুঝানো হয়েছে। একই বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রকাশকারী আরো দুটি আয়াত হচ্ছে-
‘আল্লাহর রজ্জুকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং ফিরকাবাজি করো না’। (সূরা আলে ইমরান/০৩: ১০৩)
‘আল্লাহ পছন্দ করেন তাদেরকে যারা যুদ্ধ করে তাঁর পথে সফ বা সারিবেঁধে যেন তারা বুনইয়ানুম মারসুস বা সীসাঢালা প্রাচীর’। (সূরা সফ/৬১: ০৪) । (দ্র: এখানে সফ বা সারি কথাটি আক্ষরিক অর্থে নয়, কারণ, আক্ষরিক অর্থে সফ বা সারি বেঁধে থাকলে যুদ্ধ করা যায় না) ।
‘ঐ সময়ের কথা উল্লেখ্য যখন আমি ইবরাহীমকে এ (কা’বা) ঘর নির্মাণের জন্য স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম এ নির্দেশনা সহকারে যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না, আর আমার ঘরকে পবিত্র রাখ তাদের জন্য যারা তায়িফীন ও কায়িমীন এবং রুককায়ী (রুকুকারী), সুজুদ (সিজদাকারী)’। (সূরা হজ্জ/২২: ২৬)
আলোচনা: এ আয়াতের ‘কায়িমীনা ওয়া রুককায়ীস সুজুদ’ অংশ থেকে ধারনা হতে পারে যে, সালাতে মৌলিক কাঠামো তিনটি কিয়াম-রুকু-সিজদা। কিন্তু আসলে এখানে এ তিনটি বিষয় দ্বারা সালাত বুঝানো হয়েছে এটি সুনির্দিষ্ট নয়। বিশেষত: কায়িমীন শব্দের আগে আছে ‘তায়িফীন’ যার অর্থ ‘যাতায়াতকারী’ আর এখানে এর অর্থ ‘কা’বায় যাতায়াতকারী’। আর ‘কায়িমীন’ শব্দ দ্বারা শুধু সালাতে দাঁড়ানো লোকদেরকেই বুঝায় না এবং রুকুও শুধু সালাতের অংশ নয় যা আমরা আগেই দেখেছি সূরা মায়িদার ৫৫ নং আয়াতে। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে আরো ভাবার অবকাশ আছে এবং আমরা কুরআন থেকেই এর অর্থ নির্ণয় করা সম্ভব। কুরআনে কায়িমুন (দ্র: কায়িমুন ও কায়িমীন একই শব্দের দুই রূপ) এবং এরই একটি ব্যঞ্জণা প্রকাশকারী রূপ ‘কাওয়ামীন’ শব্দ ধারনকারী আয়াতগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-
‘(নৈতিক বিচ্যুতি থেকে মুক্ত হচ্ছে তারা) যারা তাদের সাহাদাতের (সাক্ষ্যদানের) প্রতি কায়িমুন (সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত) এবং যারা তাদের সালাতের উপর হিফাজাতকারী’। (সূরা মাআরিজ/৭০: ৩৩-৩৪)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, ন্যায়বিচারের দ্বারা কাওয়ামীন (সুপ্রতিষ্ঠিত) হয়ে যাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হিসাবে যদিও তা যায় তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে, তোমাদের পিতামাতার বিরুদ্ধে এবং তোমাদের আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে, সে ধনী হোক বা গরীব হোক (তা বিবেচনার বিষয় নয়), তোমরা তাদের উভয়ের যতটুকু হিতকামী আল্লাহ তাদের উভয়ের প্রতি তার চেয়ে বেশি হিতকামী। সুতরাং আদল (ন্যায়বিচার) করার কাজে হাওয়া বা প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ো না। যদি তোমরা পেঁছালো কথা বলো বা সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ তো তোমরা যা কর তার খবর রাখেন’। (সূরা নিসা/০৪: ১৩৫)
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, ন্যায়বিচারের দ্বারা কাওয়ামীন (সুপ্রতিষ্ঠিত) হয়ে যাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাক্ষ্যদাতা হিসাবে, কোন কাওমের সাথে শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এমন অপরাধপ্রবন না করে যে, তোমরা আদল (ন্যায়বিচার) করতে পারো না। ন্যায়বিচার করো। উহাই তাকওয়ার নিকটতম। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন’। (সূরা মায়িদা/০৫: ০৮)
এসব আয়াত থেকে জানা যায় যে, কায়িমুন বলতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা লোকদেরকে বুঝায়। এছাড়া সূরা হাজ্জের ২৬ নং আয়াতে নবীউল্লাহ ইবরাহীমকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে নির্দেশ সূরা বাকারার ১২৫ আয়াতে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
‘আমি ইবরাহীম ও ইসমাইলকে আদেশ দিয়েছিলাম যেন তারা আমার ঘরকে পবিত্র রাখে তাদের জন্য যারা তায়িফীন ও আকিফীন এবং রুককায়ী (রুকুকারী) সুজুদ (সিজদাকারী)’। (সূরা বাকারা/০২: ১২৫)
এ আয়াতে পূর্বোক্ত আয়াতের কায়িমীন এর স্থানে আকিফীন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং কায়িমীন ও আকিফীন বলতে একই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে। তায়িফীন হচ্ছে যারা হাজ্জ বা উমরার সময় কা’বা তাওয়াফ করে তথা কা’বা প্রাঙ্গনে যাতায়াত করে। আকিফীন বলতে বুঝানো হয় যারা মাসজিদে এ’তেকাফ (অবস্থান) করে তাদেরকে, এর প্রমাণ হচ্ছে নিম্নের আয়াত-
‘তোমরা তোমাদের বিবিদের সাথে দেহসম্ভোগে মিলিত হয়ো না, যখন তোমরা মাসজিদে আকিফূন থাকো’। (সূরা বাকারা/০২: ১৮৭)
কায়িমূন এবং আকিফূন শব্দ একই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করার কারণে এ কথা স্পষট যে, মাসজিদ তথা কুরআনিক সমাজব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে অবস্থান করে বা প্রতিষ্ঠিত থেকে যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিবর্গ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কুরআনের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে দায়িত্ব পালন করেন তাঁরাই কায়িমীন বা আকিফীন। কা’বা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কেন্দ্রীয় মাসজিদ। এখান থেকে যাঁরা কুরআনিক বিধানসমূহ কার্যকরী করার কাজে ভূমিকা পালন করেন তাঁরাই কা’বার সাপেক্ষে কায়িমীন ও আকিফীন। আর সমগ্র বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর যে সব সদস্য হাজ্জ বা উমরার সময় কা’বায় যাতায়াত করেন তাঁরা তায়িফীন। কুরআনে আকিফীনদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যখন তাঁরা আকিফীন হিসাবে দায়িত্ব পালনের স্বার্থে মাসজিদে অবস্থান করেন ঐ সময় তথা মাসজিদের ভিতরে তাঁরা যেন স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন।
এরপর থাকে রুকুকারী ও সিজদাকারী প্রসঙ্গ। রুকুকারী বলতে যারা মানসিকভাবে আল্লাহর বিধানের প্রতি ঝুঁকে থাকে এবং সিজদাকারী বলতে যারা তাদের আনুষ্ঠানিক ও বাস্তবকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি প্রণত হয় তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রুকুকারী ও সিজদাকারী বলতে তায়িফীন ও আকিফীনদেরকে আরো দুটি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিজদাঃ সিজদার প্রকৃতি বুঝার জন্য নিম্নে কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল-
‘নক্ষত্র এবং গাছ (আল্লাহকে) সিজদা করে’। (সূর আর রহমান/৫৫: ০৬)
আলোচনা: এখান থেকে বুঝা যায়, সিজদা হচ্ছে আল্লাহর বিধান অনুসারে কর্মতৎপর থাকা।
‘তাদের (মুহাম্মাদ ও তার নিষ্ঠাবান সাথীদের) চেহারায়/মুখে/ব্যক্তিত্বে সিজদার চিহ্ন/আলামত রয়েছে’। (সূরা ফাতহ/৪৮: ২৯)
আলোচনা: এখানে সিজদা অর্থ আনুষ্ঠানিক সিজদা নয়, কারণ তাহলে চেহারা বলতে কপাল বুঝালে এ আয়াতের আলোকে নিজেকে নিষ্ঠাবান প্রমাণ করার স্বার্থে মোনাফেকও সিজদা করার সময় কপালকে মাটিতে ঘষে চিহ্ন তৈরি করতে পারবে। বরং এখানে চেহারায় সিজদার আলামত বা চিহ্ন বলতে বুঝানো হয়েছে আল্লাহর প্রতি প্রণত থাকার কারণে তাদের চেহারায় একটা দীপ্তি থাকে যা থেকে বুঝা যায় তারা সৎমানুষ অর্থাৎ তাদের চেহারায় তাদের জীবনপদ্ধতির পবিত্রতার ছাপ থাকে। সুতরাং এ আয়াতে সিজদা বলতে বাস্তব কাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি প্রণত থাকার কথা বুঝানো হয়েছে, কোন আনুষ্ঠানিক সিজদামাত্রকে বুঝানো হয়নি, তবে এর মানে এ নয় যে, তারা আনুষ্ঠানিক সিজদা দেয় না, বরং তারা শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব নয় এ কথাটিই এ আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য।
‘আর সে (ইউসুফ) তার পিতামাতাকে আরশে (আসনে) উন্নীত করলেন (উর্ধ্বে স্থাপিত আসনে বসালেন)। আর তারা (ইউসুফের পিতামাতা ও ভাইগণ) তার উদ্দেশ্যে সিজদায় প্রবৃত্ত হলো’। (সূরা ইউসুফ/১২: ১০০)
আলোচনা: এ আয়াত অনুযায়ী কাউকে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করলে তাও সিজদা। অর্থাৎ সিজদা বলতে বুঝায়, কোন ঊর্ধ্বতন বা শ্রেষ্টত্বপূর্ণ সত্তার উদ্দেশ্যে প্রণত হওয়া, আনুষ্ঠানিকভাবেও এ প্রণত হওয়াকে প্রদর্শন করা যেতে পারে।
‘(হূদহূদ আরো বললো যে,) আমি দেখলাম যে, সে (সাবার রাণী) ও তার কাওম আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যকে সিজদা করে। আর শয়তান তাদের আমলকে তাদের চোখে সুন্দর করে দেখাচ্ছে এবং তাদেরকে সঠিক পথ থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। তাই তারা হিদায়াত পায় না’। (সূরা নামল/২৭: ২৪)
‘আর সূর্য ও চাঁদকে সিজদা করো না বরং আল্লাহকে সিজদা করো যিনি ঐগুলিকে সৃষ্টি করেছেন যদি তোমরা একান্তভাবে তাঁরই ইবাদাত করতে চাও’। (সূরা হামীম/৪১: ৩৭)
আলোচনা: সূর্য ও চাঁদ বস্তুসত্তা তাই এসব কোন আদেশ দিতে পারে না, সুতরাং এসবে সিজদা করার অর্থ এসবের আদেশ মান্য করা হতে পারে না বরং এর অর্থ হচ্ছে এসবের প্রতি কোন বাহ্যিক কাজের মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করা। আর এরূপ কোন বাহ্যিক কর্মকান্ড দেখে হুদহুদ বুঝতে পেরেছে যে, সাবাবাসী সূর্যকে সিজদা করছে। যাই হোক, এ আয়াত থেকেও বুঝা যায়, সিজদার আনুষ্ঠানিক রূপ রয়েছে।
‘যেদিন কঠিন সময় আসবে এবং সিজদা করার জন্য ডাকা হবে সেদিন এসব লোক সিজদা করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি নত থাকবে, অপমান তাদের উপর ছেয়ে থাকবে। আর নিশ্চয় (পৃথিবীতে) সুস্থ থাকা অবস্থায় তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান করা হয়েছিল (আর তারা তা করেনি)’। (সূরা কলম/৬৮: ৪২-৪৩)
‘তুমি যদি ঐসময় দেখ যখন অপরাধীরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাদের রবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবে। (তখন তারা বলতে থাকবে) হে আমাদের রব, আমরা খুব দেখলাম ও শুনলাম। এখন আমাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দাও, আমরা নেক আমল করবো। এখন আমাদের ইয়াকীন এসে গেছে’। (সূরা সিজদা/৩২: ১২)
আলোচনা: এ আয়াতদুটি থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, সিজদার একটি আনুষ্ঠানিক রূপ আছে আর তা অবশ্যই শুধু দৃষ্টি নিচু করা বা মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়, কারণ, যদি তা হতো তবে তা করা সত্ত্বেও অপরাধীরা সিজদা করতে পারবে না কথাটি অর্থবহ হতো না। আসলে সামান্য কুর্নিশ করা তো সাধারণভাবে কারো উদ্দেশ্যে সিজদা বলে গণ্য হতে পারে, যেমন ইউসুফের উদ্দেশ্যে সিজদাটি হয়তো এরুপ ছিল, কিন্তু আল্লাহ যেহেতু পরম সত্তা সেহেতু তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা হবে পরমভাবে প্রণত হওয়া। তাই সামান্য মাথা ঝুঁকানো তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদা হিসাবে যথেষ্ট নয়।
বর্তমানে যেভাবে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সিজদা দেয়া হয় তা সিজদার একটি গ্রহণযোগ্য রূপ। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ কুরআনে এ রূপটিকে নির্দিষ্ট করে দেননি তাই কেউ যদি বর্তমানে যেটিকে রুকু বলে এরূপভাবে ঝুঁকে তবে তাও সিজদা বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ আল্লাহ যা নির্দিষ্ট করে দেননি, আমরা তা নির্দিষ্ট করে দিতে পারি না। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ভুলে যাননি আর তিনি আমাদেরকে সংকীর্ণতা ও কাঠিন্যে ফেলতে চাননি। তাই তিনি যা অনির্দিষ্ট রেখেছেন তা অনির্দিষ্টই তাকে অন্য কেউ সুনির্দিষ্ট করে দিতে পারে না, কারণ, বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ, আর তাঁর কোন শরীক নেই।
সিজদা কখনঃ কুরআন তিলাওয়াতের পর সিজদা দিতে হবে। কুরআনের কয়েকটি নির্দিষ্ট আয়াত (যেমন বলা হয় কুরআনের ১৪ বা ১৫ টি আয়াত এমন আছে যা) তিলাওয়াতের পর সিজদা দিতে হবে কথাটি কুরআনসিদ্ধ নয়, আর সিজদার জন্য কুরআন কয়েকটি আয়াতকে আলাদা করে দেয়নি। বরং কুরআনের আলোকে যখনই কুরআন থেকে কোন অংশ তিলাওয়াত করা হবে তখন তিলাওয়াত শেষে সিজদা করতে হবে। এ বিষয়ে কয়েকটি আয়াত নিম্নে দেয়া হল-
‘(তাদের কি হয়েছে যে,) যখন তাদের সামনে কুরআন পাঠ করা হয় তখন তারা সিজদা করে না?’ (সূরা ইনশিকাক/৮৪: ২১)
‘আমার আয়াতসমূহের উপর তারাই ঈমান (বিশ্বাস) রাখে যাদেরকে তার দ্বারা যিকর (উপদেশ প্রদান) করলে তারা তখন সিজদায় ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের রবের হামদসহ তাসবীহ করে এবং তারা কোন বড়াই করে না’। (সূরা সাজদাহ/৩২: ১৫)
‘সকলে সমান নয়। আহলি কিতাব এর মধ্যে একটি দল আছে যারা সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। তারা রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করে এবং সিজদা করে’। (সূরা আলে ইমরান/০৩: ১১৩)
উপর্যুক্ত আয়াতসমূহ থেকে জানা যায়, আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াতের পরবর্তী কাজই হলো সিজদা।
সালাতের ধারাক্রম ও করণীয়ঃ সালাতে রুকু ও খুশু থাকতে হবে এবং এ দুটি হচ্ছে মনোভাবের বিষয়। আর সালাত শুরু হবে দাঁড়িয়ে এবং শেষ হবে সিজদার মাধ্যমে। সালাতে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে আর সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ করতে হবে। সিজদার মাধ্যমে সালাত শেষ তবে সিজদার পরেও তাসবীহ করতে হবে। নিম্নে এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হল-
‘(হে রসূল) তোমার রব জানেন যে, তুমি কখনো রাতের প্রায় তিনভাগের দুইভাগ, কখনো আধারাত এবং কখনো তিনভাগের একভাগ রাত (সালাতে) দাঁড়িয়ে থাক। তোমার সাথীদের মধ্যেও একদল (এ কাজ করে)। আল্লাহই রাত ও দিনের সময়ের সঠিক হিসাব রাখতে পারেন। তিনি জানেন যে, তোমরা সময়ের সঠিক হিসাব রক্ষা করতে (সময়ের নিখুঁত হিসাব অনুযায়ী কাজ করতে) পারো না। সুতরাং তিনি তোমাদের প্রতি রহমতের খেয়াল করলেন। কুরআন ততোটুকু পাঠ করো যতটুকু সহজে পাঠ করতে পার’। (সূরা মুজজামমিল/৭৩: ২০)
তিলাওয়াতের পর সিজদা করতে হবে (দ্র: সূরা ইনশিকাক/৮৪: ২১, সাজদাহ/৩২: ১৫, আলে ইমরান/০৩: ১১৩)
সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ করতে হবে (দ্র: সূরা সাজদাহ/৩২: ১৫)
সিজদায় আল্লাহর হামদসহ তাসবীহ এর একটি উদাহরণ- সুবহানা রব্বিনা, ইন কানা ওয়া’দু রব্বিনা লামাফউলা- আমাদের রব পবিত্র। যদি কোন বিষয়ে আমাদের রবের কোন ওয়াদা থাকে তবে তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবেই’ (দ্র: সূরা বানী ইসরাইল/১৭: ১০৮)
এছাড়া সালাতের প্রধান বিষয়ই হচ্ছে আল্লাহর যিকর (দ্র: সূরা ত্বাহা/২০: ১৪) এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা (দ্র: বাকারা/০২: ৪৫, ১৫৩)।
সিজদার পরেও তাসবীহ করতে হবে (দ্র: সূরা কাফ/৫০: ৪০)।
শাহাদাঃ
3:18 شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ আরবি উচ্চারণ ৩.১৮। শাহিদাল্লা-হু আন্নাহূ লায় ইলাহা ইল্লা-হুঅ অল্মালা - য়িকাতু অ ঊলুল্ ‘ইল্মি ক্বা - য়িমাম্ বিল্ ক্বিস্ত্ব্; লায় ইলা-হা ইল্লা-হুঅল্ ‘আযীযুল্ হাকীম্। বাংলা অনুবাদ ৩.১৮ আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আর ফেরেশতা এবং জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দেয়। তিনি ন্যায়নীতিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবুদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আততাহিয়্যাতু প্রসঙ্গঃ তাহিয়্যাত অর্থ ‘কারো হায়াতের জন্য শুভ কামনা’। তাহিয়্যাতের একটি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সালাম’। কুরআনে সূরা নিসার ৮৬ আয়াতে তাহিয়্যাতের বিষয়ে বলা হয়েছে-
‘যখন কেউ তোমাদেরকে তাহিয়্যাত (বা সালাম) করে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম বা অন্তত অনুরূপভাবে তাকে তাহিয়্যাত (বা সালাম) করো। আল্লাহ অবশ্যই প্রতিটি বিষয়ে হিসাব নেবেন’। (সূরা নিসা/০৪: ৮৬)
কুরআনের কোথাও আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাতের কথা বলা হয়নি, আর বাস্তবে আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাত হতে পারে না। আল্লাহর জন্য হতে পারে হামদ ও তাসবীহ। আততাহিয়্যাতু লিল্লাহ তথা আল্লাহর জন্য তাহিয়্যাত বলা একটি শিরক। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে-
‘রসূলদের জন্য সালাম আর আল্লাহ রব্বুল আলামীনের জন্য হামদ’। (সূরা সাফফাত/৩৭: ১৮১-১৮২)
দরুদ প্রসঙ্গঃ যে আয়াতের দোহাই দিয়ে দুরুদ পড়া হয় তা হচ্ছে-
‘আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি সালাত করেন। হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত করো ও শান্তিশীল পরিবেশ বজায় রাখ’। (সূরা আহযাব/৩৩: ৫৬)
এ আয়াতে সালাত শব্দকে অনেকে দুরুদ শব্দ দিয়ে অনুবাদ করেন। আমরা ঐ অনুবাদকে সমর্থন করি না। আয়াতে বলা হয়েছে সালাত। সালাত শব্দের অর্থ সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ। সালাত আল্লাহ করেন মু’মিনদের প্রতি যা উল্লেখ থাকা একটি আয়াত হচ্ছে-
‘তিনি (আল্লাহ) ও তাঁর ফেরেশতারা তোমাদের (মু’মিনদের) প্রতি সালাত করেন। যাতে তিনি তোমাদেরকে অন্ধকারসমূহ থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসেন। তিনি মু’মিনদের প্রতি বড়ই মেহেরবান’। (সূরা আহযাব/৩৩: ৪৩)
সালাত মু’মিনরা করবে রসূলের প্রতি বা তাদের পরস্পরের প্রতি। তাহলে সালাত হলো সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণ, আর মনিবের প্রতি গোলামের এবং গোলামের প্রতি মনিবের সম্প্রীতিপূর্ণ আচরণে প্রকৃতিগত পার্থক্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা প্রতিদিন যে তিন ওয়াক্ত সালাত কায়িম করি এটা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি আনুষ্ঠানিক সালাত।
যাই হোক, রসূলের প্রতি সালাত অর্থ যদি দুরুদ হয়, প্রথম প্রশ্ন হলো, আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা যে দুরুদ পড়েন তা কোনটি? আর আল্লাহ তাঁর প্রতি দুরুদ পড়ার দরকারটাই বা কি? আসলে সালাত অর্থ দুরুদ নয়। যে আয়াতে রসূলের প্রতি সালাত করতে বলা হয়েছে তার পূর্ববর্তী আয়াতসমূহে রসূলের ঘরে প্রয়োজনে বা কম প্রয়োজনে ঘন ঘন যাতায়াত, খাওয়ার জন্য বসে থাকা, খাওয়া শেষেও বসে থাকা সাহাবীদের ইত্যাদি যেসব আচরণ রসূলের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা প্রতিরোধ করার জন্য কিছু বিধান দেয়া হয়েছে। তারপর তাঁর প্রতি সালাত করতে বলা হয়েছে। জীবিত রসূলের প্রতি সালাত করা তথা যা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক না হয়ে স্বস্তিদায়ক হবে এমন আচরণ করা সম্ভব। কিন্তু তাঁর ওফাতের তাঁর শান্তি আমাদের দুআর ওপর নির্ভর করতে পারে না, আর এজন্য আমাদের দোআর কোন প্রয়োজনই হতে পারে না। কারণ তাঁর শান্তি যদি আমাদের দোআর উপর নির্ভরশীল হয় তার মানে হয় আমরা বেশিজনে বা বেশিবার দোআ করলে তিনি বেশি শান্তি পাবেন আর কমজনে বা কমবার দোআ করলে তিনি কম শান্তি পাবেন। এটা যে কত অযৌক্তিক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ৫৩ নং আয়াতে যেমন নবীর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীদেরকে বিয়ে না করার নির্দেশ একটি যথার্থ নির্দেশ কিন্তু নবীর স্ত্রীদের ওফাতের মাধ্যমে এ নির্দেশের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিসত্তার অনুপস্থিতি দেখা দেয়ায় নির্দেশ লংঘন করা না করার ক্ষেত্র নেই তেমনি এ আয়াতে রসূলের প্রতি সালাত করার নির্দেশ রসূলের ওফাতের পূর্ববর্তী পর্যায়ের সমকালীন মু’মিনদের সাথে সম্পর্কিত। বর্তমানে তাঁর নামে দুরুদ পড়ার কোন মানে নেই।
সাধারণত নামাজে যে দুরুদটি পড়া হয় এতে স্পটত কুফরি হয়। কারণ, সূরা বাকারার ২৮৫ আয়াতসহ অনেক আয়াতে নবী ও রসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করাকে কুফরি হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। একটি আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ নবীদের একজনের উপর অন্যজনকে বিশিষ্টতা দিয়েছেন। এটি আল্লাহর নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু আমাদের প্রতি নির্দেশ হলো আমরা নবীদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবো না। বিশেষ করে, কুরআনে বলে দেয়া নাই যে, আল্লাহ অমুক নবীর চেয়ে অমুক নবীকে বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। বরং বলা আছে সকল নবীর ক্ষেত্রে আল্লাহর সুন্নাত একই রকম এবং মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহকে বলা হয়েছে যে, তিনি যেন বলে দেন যে, তিনি রসূলদের মধ্যে বিদআ (ভিন্ন নীতিভুক্ত, নতুন কোন ব্যাপার দ্বারা সংশ্লিষ্ট) নন, তিনি জানেন না তাঁর সাথে ও তাঁর সাহাবীদের সাথে আল্লাহ কী আচরণ করবেন।
অথচ নামাজে যে দুরুদ পড়ার প্রচলন করা হয়েছে তাতে বলা হয়, হে আল্লাহ ইবরাহীমকে যেভাবে অনুগ্রহ করেছো, মুহাম্মাদকে সেভাবে অনুগ্রহ করো। তার মানে ইবরাহীমের ব্যাপারে আর দোআর দরকার নাই, যত দোআ দরকার সব মুহাম্মাদের জন্য, প্রায় ১৫০০ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও এখনো সন্দেহ যে, আরো কতবার দোআ করলে আল্লাহ কবুল করবেন। প্রশ্ন হলো, স্বয়ং মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ কি নামাজে বলেছেন যে, হে আল্লাহ মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের প্রতি সালাত করো। তিনি কি বলেছেন যে, হে নবী সালাম তোমাকে আর সালাম আমাদেরকে আর সালাম আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে।
সারকথা হলো, দুরুদ একটি বিবেক বহির্ভুত এবং কুরআন বিরুদ্ধ অনুষ্ঠান।
মাতৃভাষায় সালাত প্রসঙ্গঃ আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন আরবী ভাষায়। এখন কেউ আরবী বা অন্য ভাষায় কুরআনের ভাব প্রকাশ করলে তা কুরআনের ভাবানুবাদ হবে তবে তা কুরআন নয়। অর্থাৎ কুরআন ও কুরআনের অনুবাদ এক কথা নয়। কুরআন পড়া ফরজ এবং কুরআন বুঝে পড়াই ফরজ। তাই যারা আরবী ভাষা পড়েই তার অর্থ বুঝতে পারে না তাদের কর্তব্য হচ্ছে কুরআন পড়ার পাশাপাশি মাতৃভাষায় তার অর্থ পড়া। এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে, সালাতেও কুরআন পড়ার পর তার অর্থ পড়ার পদ্ধতি অধিক উত্তম। বিশেষত সালাতে কী পড়া হচ্ছে তা বুঝার পূর্ব পর্যন্ত সালাতের ধারে কাছেও যেতে কুরআনে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। তাই সালাতে কী পড়া হচ্ছে তা বুঝার পূর্ব পর্যন্ত সালাত পড়া অবৈধ। এ বিষয়ে আয়াত হচ্ছে-
‘হে মু’মিনগণ, তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক তখন সালাতের ধারে কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা তোমরা বলছো’। (সূরা নিসা/০৪: ৪৩)
কেউ কেউ বলেন, এটি নেশাগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। তারা বুঝতে চায় না যে, নেশাগ্রস্তরা যদি বুঝার শর্ত থাকে তবে যারা নেশাগ্রস্ত নয় তাদের জন্য এ শর্ত আরো মজবুতভাবে আছে।
নফল সালাত প্রসঙ্গঃ কুরআনের আলোকে নফল সালাত হচ্ছে শুধুমাত্র তাহাজ্জুদ যা রাতের শেষার্ধ বা তার চেয়ে কম বা বেশি সময় ধরে পড়া যেতে পারে। এটি রসূলের জন্য একটি অতিরিক্ত ফরজ অর্থে নফল এবং আমাদের জন্য ফরজের অতিরিক্ত অর্থে নফল। দিনের বেলায় কোন নফল নামাজ না থাকার কারণ হিসাবে আল্লাহ বলেন-
‘দিনের বেলায় তো তোমার অনেক ব্যস্ততা আছে’। (সূরা মুজজামমিল/৭৩: ০৭)
তাহাজ্জুদ ব্যতীত আর কোন নফল সালাত নেই। ইশরাকের সালাত, চাসতের সালাত, আওয়াবীন সালাত, কুসুফের সালাত, খুসুফের সালাত, তারাবীর সালাত, ঈদের সালাত ইত্যাদি সবই বিদআত।
সালাত বনাম তাসবীহ এবং সালাতের প্রস্তুতিঃ কেউ কেউ সালাতের ওয়াক্ত উল্লেখ করতে গিয়ে তাসবীহ সম্পর্কিত কিছু আয়াত উল্লেখ করেন। অথচ তাসবীহ এবং সালাত অভিন্ন বিষয় নয়। সালাতের জন্য যে প্রস্তুতির শর্ত (ওজু, গোসল, তায়াম্মুম) আছে তাসবীহর জন্য তা নেই বা সালাতের জন্য যে পদ্ধতি আছে তাসবীহর জন্য তা নেই। নিচে সালাতের প্রস্তুতি সম্পর্কিত দুইটি আয়াত উল্লেখ করা হলো-
‘হে ঐসব লোক যারা ঈমান (বিশ্বাস) করেছো, তোমরা যখন সালাতের দিকে দাঁড়াও (সালাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণার্থে উদ্যোগী হও) তখন তোমাদের (সমস্ত) মুখমন্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধুয়ে নাও এবং তোমাদের (সম্পূর্ণ) মাথা মাসেহ করো এবং তোমাদের টাখনু পর্যন্ত তোমাদের পা (ধুয়ে নাও)। যদি (বীর্যপাতজনিত কারণে) নাপাক অবস্থায় থাকো তাহলে গোসল করে পাক হও। যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ পেশাব পায়খানা করে আসে বা তোমরা স্ত্রীমিলন কর আর এ অবস্থায় পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো (অর্থাৎ) মাটি হাতে মেখে মুখ ও হাত মাসেহ করো। আল্লাহ তোমাদের জীবনে কঠোরতা চাপাতে চান না। তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান। আর তিনি তোমাদের উপর তাঁর নিআমাত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার’। (সূরা মায়িদা/০৫: ০৬)
‘নাপাক অবস্থায় গোসল না করে নামাজের ধারে কাছেও যেও না, তবে পথ অতিক্রমকারী হলে ভিন্ন কথা’। (সূরা নিসা/০৪: ৪৩)
আলোচনা: প্রত্যেক ওয়াক্তের সালাতের প্রস্তুতির শর্ত হিসাবে ওজু করতে হবে। কেউ ওজু করার পর সালাত পড়ার আগে পায়খানা বা পেশাব করলে তাকে আবারো ওজু করতে হবে, ওজু ছাড়া নামাজ পড়া যাবে না। কিন্তু ওজু করার পর পায়খানা বা পেশাব না করলেও একই ওজুতে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়া যাবে না।
শেষকথাঃ প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসাবে বেশি প্রশ্ন আসে আমরা হাদীসে রসূল নামে খ্যাত বুখারী, মুসলিম ইত্যাদিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবো? এ প্রশ্ন এমন এক দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে যা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা বিষয়। তাই আমরা এ প্রবন্ধে এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলাম। এছাড়া আরো তিনটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়- (১) যারা বর্তমান কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেন তারা কেন তা করলেন এবং কিভাবে তা করতে পারলেন? (২) এত যুগ ধরে এত আলেম মিলে কি ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি ও পারছেন না? (৩) যারা প্রচলিত কাঠামোকে সঠিক মনে করে আমল করে ওফাত বরণ করেছেন তাদের কি হবে? আমার পাল্টা প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের করণীয় নির্ধারণে কি সত্যি এসব প্রশ্নের কোন ভূমিকা আছে? আর আমরা যদি সত্যি আল্লাহকে ন্যায়বিচারক বলে বিশ্বাস করি তাহলে এসব প্রশ্ন কি আদৌ উত্থাপিত হওয়ার যোগ্য? আমাদেরকে ভাবতে হবে যে, সত্য আসার পর টালবাহানা করা অত্যন্ত বড় অপরাধ। আমরা ভাবতে হবে, আমরা কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য জবাব দিতে পারবো? আমরা ভুল চিন্তা ও অন্ধ অনুসরণজনিত শিরক থেকে বাঁচতে চাই এবং আল্লাহর আদেশ যথাযথভাবে জেনে ও মেনে যথাযথ কল্যাণ লাভ করতে চাই।
ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ, তাওয়াক্কালতু আলাইহি ওয়া ইলাইহি উনিব’। (সূরা হূদ/১১: ৮৮)
Copy from original post...
https://sites.google.com/site/worldmuslaimummah/salat-in-3-times
##################################
২/সিজদার দোয়াঃ
1/
(2:131)
إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ ***أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ**
স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেনঃ অনুগত হও। সে বললঃ ***আমি বিশ্বপালকের অনুগত হলাম***
**(আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন)**
2/
وَيَقُولُونَ ***سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا*** 17.108
আরবি উচ্চারণ
১৭.১০৮। অ ইয়াকুলূনা ***সুব্হা-না রব্বিনা য় ইন্ কা-না ওয়া’দু রব্বিনা-লামাফ্‘ঊলা***
বাংলা অনুবাদ
১৭.১০৮আর তারা বলে,**** ‘পবিত্র মহান আমাদের রব! আমাদের রবের ওয়াদা অবশ্যই কার্যকর হয়ে থাকে’***
3/
****সুবহানা রাব্বিনা'ল আলা***
(১৭ঃ১০৮, ৮৭ঃ১)
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
# রুকুতে যাওয়ার সময়ঃ
***আল্লাহু আকবার***
রুকুর দোয়াঃ
১/
قَالَ **رَبِّ إِنِّى ظَلَمۡتُ نَفۡسِى فَٱغۡفِرۡ لِى** فَغَفَرَ لَهُ ۥۤۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ١٦
আরবি উচ্চারণ
২৮.১৬। ক্ব-লা **রব্বি ইন্নী জোয়ালাম্তু নাফ্সী ফার্গ্ফিলী** ফাগফার লাহ্;ইন্নাহূ হুওয়াল্ গফূর্রু রহীম্।
২৮.১৬ ‘***হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নফ্সের প্রতি যুলম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’।***
২/
(7:143)
وَلَمَّا جَاء مُوسَى لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي فَلَمَّا تَجَلَّى رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ موسَى صَعِقًا فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ ***سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَاْ أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ**
**সুবহানাকা তুব্তু ইলাইকা ওয়া আনা আওওয়ালুল মুমিনীন**
***হে প্রভু! তোমার সত্তা পবিত্র, তোমার দরবারে আমি তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করছি**
৩/
(7:151)
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلأَخِي وَأَدْخِلْنَا فِي رَحْمَتِكَ ***وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ***
***ওয়া আংতা আর হামুর রাহিমীন***
***তুমি যে সর্বাধিক করুণাময়***
রুকু থেকে উঠেঃ
সুবহানা রাব্বিনা'ল আযিম। (১৭ঃ১০৮, ৫৬ঃ৭৪)
##################################
কোরান যথেষ্ট
সুরা আল-যুমার(৩৯) আয়াত ১৮ যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে , অতঃপর যা উত্তম , তার অনুসরন করে। তাদেরকেই আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।
কোরান থেকে নামাজ
৬:১১৪-১১৫. তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ন করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ন হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।
নামাজ ফারসি শব্দ। কোরানে বর্ণীত আকিমুস সালাতের অর্থ ব্যাপক হলেও আমরা সাধারনত সালাত বলতে নামাজ পড়াকেই বুঝে থাকি।কোরানে ৬৭ বার সালাতের উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরে ও সালাতের খুটিনাটির খোঁজে যারা কোরান ছাড়া অন্য গ্রন্থের স্মরনাপন্ন হয় , তারা কোরানে বর্নীত সেই ইহুদিদের কথাই মনে করিয়ে দেয় , যাদেরকে গরু জবাই করতে বলা হয়েছিল। যে কোন একটি গরু জবাই দিলেই যখন সহজে কাজ সমাধা হয়ে যেত , সেখানে খুটিনাটি জানতে চেয়ে তারা গরু খোঁজার কাজটি কঠিন করে তুলেছিল।
২:৬৭-৭০ যখন মূসা (আঃ) স্বীয় সম্প্রদায়কে বললেনঃ আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাই করতে বলেছেন। তারা বলল, তুমি কি আমাদের সাথে উপহাস করছ? মূসা (আঃ) বললেন, মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
তারা বলল, তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর, যেন সেটির রূপ বিশ্লেষণ করা হয়। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলছেন, সেটা হবে একটা গাভী, যা বৃদ্ধ নয় এবং কুমারীও নয়-বার্ধক্য ও যৌবনের মাঝামাঝি বয়সের। এখন আদিষ্ট কাজ করে ফেল।
তারা বলল, তোমার পালনকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর যে, তার রঙ কিরূপ হবে? মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেছেন যে, গাঢ় পীতবর্ণের গাভী-যা দর্শকদের চমৎকৃত করবে।
তারা বলল, আপনি প্রভুর কাছে প্রার্থনা করুন-তিনি বলে দিন যে, সেটা কিরূপ? কেননা, গরু আমাদের কাছে সাদৃশ্যশীল মনে হয়। ইনশাআল্লাহ এবার আমরা অবশ্যই পথপ্রাপ্ত হব। মূসা (আঃ) বললেন, তিনি বলেন যে, এ গাভী ভূকর্ষণ ও জল সেচনের শ্রমে অভ্যস্ত নয়-হবে নিষ্কলঙ্ক, নিখুঁত।
একে একে কোরান থেকে নিম্ন লিখিত বিষয় নিয়ে লিখব -
১) সালাতের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য
২) সালাতের ইতিহাস
৩) সালাত পূর্ব করনীয়
৪) সালাতে অঙ্গবিন্যাস
৫) সালাতে কি বলতে হবে?
৬) দৈনিক সালাতের সংখ্যা
৭) কয় রাকাত?
৮) জুমা বারের সালাত
৯) আমার সালাত
১) সালাতের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য
আল্লাহকে স্মরন করার জন্যই সালাত।
২০:১৪ আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।
সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে।
২৯:৪৫ আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর।
এই আয়াত থেকে আমরা আরো জানতে পারি – আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। সালাত আল্লাহকে স্মরন করার একটা উপায় মাত্র। সালাত ছাড়াও আল্লাহকে স্মরন করা যায় এবং সকলসময় সেটাই করতে বলা হয়েছে কোরানে।
৪:১০৩ অতঃপর যখন তোমরা সালাত সম্পন্ন কর, তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর। অতঃপর যখন বিপদমুক্ত হয়ে যাও, তখন সালাত ঠিক করে পড়। নিশ্চয় সালাত মুসলমানদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
সালাত পরকালের জন্য সর্বোত্তম বিনিয়োগ
৩৫:২৯ যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা কর, যাতে কখনও লোকসান হবে না।
সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে বলা হয়েছে।
২:৪৫ ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর সালাতের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।
২:১৫৩ হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।
২) সালাতের ইতিহাস
সালাতের ইতিহাস অনেক পুরনো। কোরান থেকে যেটা জানা যায় ইব্রাহিম নবীর সময় থেকে শুরু করে পরবর্তি সকল নবী রসূলের আমলে সালাত প্রচলিত ছিল। সময়ের সাথে সাথে মানুষ সঠিক সালাত ভুলে গিয়েছিল বা বিকৃত করে ফেলেছিল।
সালাত ১৪০০ বছর আগের নুতন কোন আবিস্কার নয়। কোরান থেকেই জানতে পারি , রসূল মুহাম্মদের সমসাময়িক কাফের মুশরিকরা ও সালাত পালন করত। তবে তাদের প্রধান উপাস্য আল্লাহর সাথে সাথে অন্যান্য শরীক আলাত , মানাত ও উজ্জার উপাসনা ও করত। তাদের বিশ্বাস ছিল এই শরীকরা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তি করবে , তাদের জন্য সুপারিশ করবে। রসূলকে দিয়ে আল্লাহ সালাতকে শরীকমুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহ বন্দনা ও আল্লাহর স্মরনে সঠিক সালাত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
শয়তান তো আর হাত গুটিয়ে বসে নেই। তাই তো দেখতে পাই আজকের মুসলমানেরা সালাতে আল্লাহর সাথে সাথে অন্যান্য শরিকদের স্মরন করে , তাদের জন্য প্রার্থনা করে। না করলে নাকি সালাতই হবে না। এদের বিশ্বাস এই শরীকরা তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তি করবে , আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে। শরীকদের গ্রন্থ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব অনুসরনের কথা বল্লে , গালাগালির নহর বয়ে যায় , শারীরিক নিগ্রহের ধামকি দেয় , কন্ঠরোধের হুমকিই শুধু দেয় না বাস্তবেই কন্ঠরোধ করে।
ইব্রাহিমের সালাত।
২:১২৫ যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে সালাতের ( مُصَلًّى) জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।
মূসা ও হারুনের সালাত।
১০:৮৭ আর আমি নির্দেশ পাঠালাম মূসা এবং তার ভাইয়ের প্রতি যে, তোমরা তোমাদের জাতির জন্য মিসরের মাটিতে বাস স্থান নির্ধারণ কর। আর তোমাদের ঘরগুলো বানাবে কেবলামুখী করে এবং সালাত কায়েম কর আর যারা ঈমানদার তাদেরকে সুসংবাদ দান কর।
ঈসার সালাত।
১৯:৩১ আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে।
শুয়েবের সালাত।
১১:৮৭ তারা বলল-হে শোয়ায়েব (আঃ) আপনার সালাত কি আপনাকে ইহাই শিক্ষা দেয় যে, আমরা ঐসব উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব আমাদের বাপ-দাদারা যাদের উপাসনা করত? অথবা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি, তা ছেড়ে দেব? আপনি তো একজন খাস মহৎ ব্যক্তি ও সৎপথের পথিক।
জাকারিয়ার সালাত।
৩:৩৯ যখন তিনি কামরার ভেতরে সালাতে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বললেন যে, আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়া সম্পর্কে, যিনি সাক্ষ্য দেবেন আল্লাহর নির্দেশের সত্যতা সম্পর্কে, যিনি নেতা হবেন এবং নারীদের সংস্পর্শে যাবেন না, তিনি অত্যন্ত সৎকর্মশীল নবী হবেন।
বণী ইস্রাইলের সালাত।
২:৪৩ আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং সালাতে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়।
লুকমানের সালাত।
৩১:১৭ হে বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।
রসূলের সমসাময়িক কাফেরদের সালাত।
৮:৩৫ আর কা’বার নিকট তাদের সালাত শিস দেয়া আর তালি বাজানো ছাড়া অন্য কোন কিছুই ছিল না। অতএব, এবার নিজেদের কৃত কুফরীর আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর।
আল্লাহর নিকটবর্তি হওয়ার আশায় শরীকদের জন্য উপাসনা।
৩৯:৩ জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ এবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।
৩) সালাত পূর্ব করনীয়
৪:১০৩ …….. নিশ্চয় সালাত বিশ্বাসীদের উপর ফরয নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।
আল্লাহর স্মরন সর্বশ্রেষ্ঠ। বাস্তবে আমরা জীবণ ও জীবিকার অন্বেষনে এমনই ব্যাস্ত হয়ে পড়ি যে আল্লাহকে সকল সময় স্মরন করার কথা ভুলেই যাই। সকল কাজ কাম বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সালাত ফরজ হওয়ায় আল্লাহকে স্মরনের কাজটি বিশ্বাসীদের জন্য সহজ হয়ে গিয়েছে।
সালাত একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার। সালাতের পূর্বে ও সালাত চলাকালিন কিছু শর্ত পালন আবশ্যকীয়। এই শর্ত মানসিক ও শারিরীক উভয় প্রকারের।
সচেতন মন
যেহেতু বিশ্বাসীরা সালাতের মাধ্যমে আল্লাহকে আল্লাহকে স্মরন করে ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে , সে কারনে সালাতে কি বলছে সেটা বোঝা আবশ্যকীয় করা হয়েছে। একারনে আমরা দেখতে পাই নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তি হতে নিষেধ করা হয়েছে।
৪:৪৩ হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, ………
বিনয়ী বিনীত
২৩:১-২ মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্র।
লোক দেখানো সালাত
১০৭:৪-৬ অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর (না বুঝে পড়ে); যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে।
পরিধেয় বস্ত্র
৭:৩১ হে বনী-আদম! তোমরা প্রত্যেক সালাতের সময় সাজসজ্জা পরিধান করে নাও,………
জুতা
২০:১২ আমিই তোমার পালনকর্তা, অতএব তুমি জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় রয়েছ।
ওজু – গোসল – তায়াম্মুম
৫:৬ হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামাযের জন্যে উঠ, তখন স্বীয় মুখমন্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং পদযুগল গিটসহ। যদি তোমরা অপবিত্র হও তবে সারা দেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাক অথবা তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-অর্থাৎ, স্বীয় মুখ-মন্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান-যাতে তোমরা কৃতজ্ঞাতা প্রকাশ কর।
৪:৪৩ হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ, আর (নামাযের কাছে যেও না) ফরয গোসলের আবস্থায়ও যতক্ষণ না গোসল করে নাও। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও-তাতে মুখমন্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল।
কিবলা
২:১৪২ এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান।
২:১৪৪ নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।
২:১৭৭ সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী-রসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্নীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য্য ধারণকারী তারাই হল সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।
সালাতে অঙ্গবিন্যাস
কোরানে সালাত ব্যাপক অর্থে ব্যাবহৃত হলেও এই পোস্টে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সালাত যেটাকে আমরা নামাজ বলে জানি , সেটার ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকব।
আনুষ্ঠানিক সালাতের উদাহরন আমরা দেখতে পাই ৪:১০২ আয়াতে। কোরানের আয়াতগুলো থেকে আমরা সালাতে ৩ টি পজিশান বা শারীরিক অবস্থানের কথা জানতে পারি। দাড়ানো , রুকু ও সেজদা।
৪:১০২ নং আয়াত থেকে এটা পরিস্কার , সালাত শুরু হবে দাড়ানোর মাধ্যমে এবং শেষ হবে সেজদার মধ্য দিয়ে।
দাড়ানো
২:২৩৮ সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত
আদবের সাথে দাঁড়াও।
রুকু
২:৪৩ আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং সালাতে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়। ( যেটাকে আমরা রুকু বলে জানি وَارْكَعُواْ مَعَ الرَّاكِعِينَ)
৯:১১২ তারা তওবাকারী, এবাদতকারী, শোকরগোযার, (দুনিয়ার সাথে) সম্পর্কচ্ছেদকারী, রুকু ও সিজদা আদায়কারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং আল্লাহর দেওয়া সীমাসমূহের হেফাযতকারী। বস্তুতঃ সুসংবাদ দাও ঈমানদারদেরকে।
সেজদা
৪:১০২ যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়। কাফেররা চায় যে, তোমরা কোন রূপে অসতর্ক থাক, যাতে তারা একযোগে তোমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও তবে স্বীয় অস্ত্র পরিত্যাগ করায় তোমাদের কোন গোনাহ নেই এবং সাথে নিয়ে নাও তোমাদের আত্নরক্ষার অস্ত্র। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের জন্যে অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।
সালাতে কি বলতে হবে?
সালাতে আমরা যেটাই বলিনা কেন , সেটা বুঝে বলতে হবে এবং মধ্যম স্বরে বলতে হবে। মনে মনে ও না বা চেচিয়ে পাড়া মাথায় করাও না। এটাই কোরানিক নির্দেশ। ১৭:১১০ আয়াত যেহেতু সালাত সংক্রান্ত , সেহেতু ১৭:১১১ আয়াতেও সালাতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে। সালাতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর স্মরন করি , তার সাহায্য প্রার্থনা করি , তার প্রশংসা করি সর্বপরি তার উপাসনা করি। সুরা ফাতেহার ৭ টি আয়াতের মাধ্যমে এগুলোর সবি করা সম্ভব। ধারনা করা হয় ১৫:৮৭ আয়াতে সুরা ফাতেহার কথাই বলা হয়েছে (আল্লাহই ভাল জানেন)। আল্লাহ কোরানে তার পবিত্রতা ঘোষনা করতে বলছেন , যেটা আমরা করে থাকি রুকু ও সেজদাতে।
সালাতে মধ্যম স্বর
১৭:১১০ বলুনঃ আল্লাহ বলে আহবান কর কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান কর না কেন, সব সুন্দর নাম তাঁরই। আপনি নিজের নামায আদায়কালে স্বর উচ্চগ্রাসে নিয়ে গিয়ে পড়বেন না এবং নিঃশব্দেও পড়বেন না। এতদুভয়ের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করুন।
তাকবীর (আল্লাহু আকবর) বা আল্লাহর মহত্ব বর্ণনা করা
১৭:১১১ বলুনঃ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি না কোন সন্তান রাখেন, না তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন শরীক আছে এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না, যে কারণে তাঁর কোন সাহয্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং আপনি স-সম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ন (وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا) বর্ণনা করতে থাকুন।
কোরান থেকে পাঠ করা
২৯:৪৫ আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন।
সূরা ফাতেহা
১৫:৮৭আমি আপনাকে সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কোরআন দিয়েছি।
রুকু ও সেজদাতে তাসবীহ
৫৬:৭৪
فَسَبِّحْ بِاسْمِ رَبِّكَ الْعَظِيمِ
অতএব, আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামে পবিত্রতা ঘোষণা করুন।
৮৭:১
سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى
আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা বর্ণনা করুন
৫০:৪০ রাত্রির কিছু অংশে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং নামাযের পশ্চাতেও (السُّجُودِ)।
শাহাদা
৩:১৮ আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। ফেরেশতাগণ এবং ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।
দৈনিক সালাতের সংখ্যা
কোরানে পরিস্কারভাবে বলা নেই , দৈনিক কয়বার সালাতের জন্য দাড়ানো লাগবে। কেন কোরানে দৈনিক সালাতের সংখ্যার পরিস্কার উল্লেখ নেই , তার গূঢ় কারন আল্লাহই ভাল জানেন। যেহেতু কোরানে দৈনিক সালাতের সংখ্যার পরিস্কার উল্লেখ নেই , সেহেতু ধরে নেয়া যায় দৈনিক সালাতের সংখ্যা নির্ধারনের ভার আল্লাহ মুত্তাকিনদের বুঝের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন।
একারনে আমরা দেখতে পাই , কেউ বলছেন কোরানে দৈনিক ৫ বার , কেউ বা দৈনিক ৩ বার , আবার কেউ বা দৈনিক ২ বার সালাতের কথা বলা হয়েছে বলে দাবি করছেন।
যারা দৈনিক ২বার সালাতের কথা বলেন তাদের যুক্তি হলো , কোরানে ২ টি সালাতের নাম খুজে পাওয়া যায় – ‘সালাতুল ফজর’ এবং ‘সালাতুল ঈশা’। যোহর , আছর ও মাগরিব নামে কোন সালাতের কথা কোরানে বলা নেই।
যারা দৈনিক ৩/৫ বার সালাতের কথা বলেন তাদের যুক্তি হলো , কোরানে ২:২৩৮
حَافِظُواْ عَلَى الصَّلَوَاتِ ‘সালাওয়াত’ সংরক্ষনের কথা বলা হয়েছে। ‘সালাওয়াত’ সালাতের বহুবচন অর্থাৎ তিন বা ততোধিক সালাত। এর সপক্ষে এরা আরো একটি সালাতের কথা বলেন , যার নাম ‘সালাতুল উস্তা’। ‘সালাতুল উস্তা’ অর্থ কেউ করেছেন মধ্যবর্তী সালাত , আর দৈনিক ২বার সালাতের সমর্থকরা করেছেন উত্তম সালাত , যেটা ফজর বা ঈশাকেই নির্দেশ করে।
দৈনিক ২বার সালাত
24:58 হে মুমিনগণ! তোমাদের দাসদাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখ এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্যে কোন দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়, এমনি ভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
11:114 আর দিনের দুই প্রান্তেই নামায ঠিক রাখবে, এবং রাতের প্রান্তভাগে পূর্ণ কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়, যারা স্মরণ রাখে তাদের জন্য এটি এক মহা স্মারক।
দৈনিক ৩ বার সালাত
2:238 সমস্ত নামাযের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সাথে দাঁড়াও।
দৈনিক ৫ বার সালাত
17:78 সূর্য ঢলে পড়ার সময় থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত নামায কায়েম করুন এবং ফজরের কোরআন পাঠও। নিশ্চয় ফজরের কোরআন পাঠ মুখোমুখি হয়।
(1) The Dawn Prayer (Fajr in Arabic) given in 11:114, 24:58
(2) The Noon Prayer (Zuher in Arabic) , given in 17:78
(3) The Afternoon Prayer (Asr in Arabic), given in 2:238
(4) The sunset Prayer (Maghrib in Arabic), given in 11:114
(5) The Night Prayer (Isha in Arabic), given in 24:58
কয় রাকাত?
কোরানে রাকাতের কথা বলা নেই। তবে যদি আমরা ৪:১০২ নং আয়াতটি নিয়ে চিন্তা করি , তাহলে সালাতে ২ টি রাকাত আছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
৪:১০২ যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়।
কোরআনের আলোকে যাকাতঃ
যাকাতের ব্যাপারে শরীয়ত অনুযায়ী চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এর সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক উত্তর হাদীস ছাড়া শুধু কোরানের ভিত্তিতে শুরুতে পয়েন্ট করে দিলাম। এরপর প্রতিটি বিষয় কোরানের রেফারেন্স দিয়ে সুনির্দিষ্ট ভাবে ব্যাখ্যা করেছি।
১. কোন কোন সম্পদে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোন সম্পদে।
২. সম্পদ কত পরিমাণে থাকলে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ প্রয়োজনের অতিরিক্ত থাকলে।
৩. কি হারে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ ২০% হারে। অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবটুকু।
৪. কোন ব্যক্তিদের যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ ফকির, মিসকীন, এতীম-অসহায়, নিকটাত্মীয়, যাকাত আদায় কারী, দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। পুরোটা কোরান খুঁজলে আরও পাওয়া যেতে পারে।
কোরান অনুযায়ী যাকাত ২০% হওয়া উচিৎ। শুনেছি শিয়ারা নাকি তাদের হাদীস অনুযায়ী ২০% যাকাত দেয়। দেখা যাচ্ছে শিয়ারা এই ক্ষেত্রে সঠিক পথে আছে।
যাকাত আরবী শব্দ, এর অর্থ পবিত্রতা। কিন্তু শরীয়ত অযথাই এর অর্থ পরিবর্তন করে ২.৫% বাধ্যতামূলক দান হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। শব্দের প্রকৃত অর্থ ব্যবহার না করার এমন শরীয়তী উদাহরণ আরও অনেক আছে। তার মাঝে একটি এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবেই উল্লেখ করতে হচ্ছেঃ
''গণি'' আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ ''ধনী'' বা ''সম্পদশালী''। এই শব্দের ভিন্ন রুপ হচ্ছে ''গণিমত'' যার অর্থ ''ধন'' বা ''সম্পদ'' (সূরা নিসা- ৪:৯৪)। কিন্তু শরীয়ত ''গণিমত'' মানে শুধুমাত্র ''যুদ্ধলব্ধ সম্পদ'' আখ্যায়িত করে। কোরানে যুদ্ধলদ্ধ সম্পদকে আনফাল বলা হয়েছে (সূরা আনফাল-৮:১)। আর যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত শত্রুপক্ষের কোন সম্পদকে ফাই বলা হয়েছে (সূরা হাশর- ৫৯:৬)। যে সম্পদ ''আনফাল'' বা ''ফাই'' অথবা ''অন্য যেকোন উপায়ে প্রাপ্ত ধন সে সম্পদকে ''গণিমত'' বলা যায়।
আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে সবসময় রিজিক দেওয়ার কথা বলেছেন, কখনও বলেছেন, “ আমি যাকে খুশি বেহিসাব রিজিক দিয়ে থাকি (সুরা-ইমরান-৩:২৭)। অনেক জায়গায় বলেছেন, আমি রিজিক বৃদ্ধি করে দিই আবার কারো রিজিক সংকীর্ণ করি। আমি তাহাদিগকে যে রিজিক দেই তাহা থেকে ব্যয় করে (সুরা আল বাকারা-২:৩)। পৃথিবীতে খাওয়া-পরা এবং যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীকে রিজিক বলা হয়, আর এই রিজিক যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয় তখন রিজিকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশকে ধন বা গণিমা বলে। এই প্রয়োজনাতিরিক্ত রিজিকের মালিককে আমরা গণী বা ধনী বলি।
সুরা আনফালের ৪১নং আয়াতে বলা হয়েছে, আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গণিমত (প্রয়োজানাতিরিক্ত রিজিক) হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চামাংশ আল্লাহর জন্য এবং রসুলের জন্য ও নিকটাত্মীয়দের জন্য আর এতীম-অসহায় সহ অন্যান্যদের জন্য। আয়াতে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মত আমাদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ মিটানোর পর আয়ের অতিরিক্ত অংশ থেকে একপঞ্চমাংশ (২০%) বায়তুল মালে অর্থাৎ ইসলামী কোষাগারে জমা হবে। যাকে বর্তমানে প্রচলিত যাকাত প্রদান করার সাথে তুলনা করা যায়।
সদকা (শরীয়ত এইখানে যাকাত অনুবাদ করে!) হল কেবল ফকির, মিসকীন, সদকা আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (সুরা তওবা-৯:৬০)।
আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী ছদকার খরচের খাতসমূহ জাতীয় পর্যায়ে বিবেচনা করলে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায় । জাতীয় পর্যায়ের পরিমাণ এবং সংগ্রহের ব্যাবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপকতা প্রকাশ পায়।
কি পরিমাণ ব্যায় করব তার উত্তরে বলা হয়েছে, যে পরিমাণ সহজ হয় (সুরা বাকারাহ-২:২১৯)। এছাড়াও কোরানে বলা আছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব কিছুই দান/ব্যয় করতে।
১. কোন কোন সম্পদে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোন সম্পদে।
২. সম্পদ কত পরিমাণে থাকলে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ প্রয়োজনের অতিরিক্ত থাকলে।
৩. কি হারে যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ ২০% হারে। অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবটুকু।
৪. কোন ব্যক্তিদের যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ ফকির, মিসকীন, এতীম-অসহায়, নিকটাত্মীয়, যাকাত আদায় কারী, দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। পুরোটা কোরান খুঁজলে আরও পাওয়া যেতে পারে।
কোরান অনুযায়ী যাকাত ২০% হওয়া উচিৎ। শুনেছি শিয়ারা নাকি তাদের হাদীস অনুযায়ী ২০% যাকাত দেয়। দেখা যাচ্ছে শিয়ারা এই ক্ষেত্রে সঠিক পথে আছে।
যাকাত আরবী শব্দ, এর অর্থ পবিত্রতা। কিন্তু শরীয়ত অযথাই এর অর্থ পরিবর্তন করে ২.৫% বাধ্যতামূলক দান হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। শব্দের প্রকৃত অর্থ ব্যবহার না করার এমন শরীয়তী উদাহরণ আরও অনেক আছে। তার মাঝে একটি এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবেই উল্লেখ করতে হচ্ছেঃ
''গণি'' আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। এর অর্থ ''ধনী'' বা ''সম্পদশালী''। এই শব্দের ভিন্ন রুপ হচ্ছে ''গণিমত'' যার অর্থ ''ধন'' বা ''সম্পদ'' (সূরা নিসা- ৪:৯৪)। কিন্তু শরীয়ত ''গণিমত'' মানে শুধুমাত্র ''যুদ্ধলব্ধ সম্পদ'' আখ্যায়িত করে। কোরানে যুদ্ধলদ্ধ সম্পদকে আনফাল বলা হয়েছে (সূরা আনফাল-৮:১)। আর যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত শত্রুপক্ষের কোন সম্পদকে ফাই বলা হয়েছে (সূরা হাশর- ৫৯:৬)। যে সম্পদ ''আনফাল'' বা ''ফাই'' অথবা ''অন্য যেকোন উপায়ে প্রাপ্ত ধন সে সম্পদকে ''গণিমত'' বলা যায়।
আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাকে সবসময় রিজিক দেওয়ার কথা বলেছেন, কখনও বলেছেন, “ আমি যাকে খুশি বেহিসাব রিজিক দিয়ে থাকি (সুরা-ইমরান-৩:২৭)। অনেক জায়গায় বলেছেন, আমি রিজিক বৃদ্ধি করে দিই আবার কারো রিজিক সংকীর্ণ করি। আমি তাহাদিগকে যে রিজিক দেই তাহা থেকে ব্যয় করে (সুরা আল বাকারা-২:৩)। পৃথিবীতে খাওয়া-পরা এবং যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রীকে রিজিক বলা হয়, আর এই রিজিক যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয় তখন রিজিকের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশকে ধন বা গণিমা বলে। এই প্রয়োজনাতিরিক্ত রিজিকের মালিককে আমরা গণী বা ধনী বলি।
সুরা আনফালের ৪১নং আয়াতে বলা হয়েছে, আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোন বস্তু সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গণিমত (প্রয়োজানাতিরিক্ত রিজিক) হিসাবে পাবে, তার এক পঞ্চামাংশ আল্লাহর জন্য এবং রসুলের জন্য ও নিকটাত্মীয়দের জন্য আর এতীম-অসহায় সহ অন্যান্যদের জন্য। আয়াতে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মত আমাদের যাবতীয় প্রয়োজনীয় খরচ মিটানোর পর আয়ের অতিরিক্ত অংশ থেকে একপঞ্চমাংশ (২০%) বায়তুল মালে অর্থাৎ ইসলামী কোষাগারে জমা হবে। যাকে বর্তমানে প্রচলিত যাকাত প্রদান করার সাথে তুলনা করা যায়।
সদকা (শরীয়ত এইখানে যাকাত অনুবাদ করে!) হল কেবল ফকির, মিসকীন, সদকা আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে-ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (সুরা তওবা-৯:৬০)।
আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী ছদকার খরচের খাতসমূহ জাতীয় পর্যায়ে বিবেচনা করলে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ইঙ্গিত পাওয়া যায় । জাতীয় পর্যায়ের পরিমাণ এবং সংগ্রহের ব্যাবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ব্যাপকতা প্রকাশ পায়।
কি পরিমাণ ব্যায় করব তার উত্তরে বলা হয়েছে, যে পরিমাণ সহজ হয় (সুরা বাকারাহ-২:২১৯)। এছাড়াও কোরানে বলা আছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব কিছুই দান/ব্যয় করতে।
Thursday, October 11, 2018
Subscribe to:
Comments (Atom)


